সুষম খাদ্য (Balanced diet

সুষম খাদ্য (Balanced diet)

সুষম খাদ্য (Balanced diet)

আশরাফুল মাখলুকাত মানুষ সৃষ্টির সেরা শ্রেষ্ঠ জীব। তাই মানুষ সৃষ্টির পূর্বেই পরমকরুনাময় আল্লাহতায়ালা তার বান্দার প্রয়োজনীয় খাদ্য এই পৃথিবীতে সৃষ্টি করে রেখেছেন। সাধারণত খাদ্য খেয়েই মানুষের জীবনধারণ করতে হয়। মানুষের পাঁচটি মৌলিক চাহিদা অন্ন, বস্ত্র, বাসস্থান, শিক্ষা ও স্বাস্থ্য। এর মধ্যে খাদ্যও স্বাস্থ্য হল মানুষের মৌলিক চাহিদাগুলির অন্যতম। মানুষ মনে করে পেট ভরে খেতে পারলে স্বাস্থ্য সুরক্ষা হবে। ক্নিতু পুষ্টি বিজ্ঞানীদের মতে মানুষকে সুস্থ, সবল, সুন্দর ভাবে বেঁচে থাকার জন্য তার শরীরের চাহিদা অনুযায়ী পুষ্টিকরও সুষম খাবার খাওয়া একান্ত প্রয়োজন। আমরা জানি খাদ্যের ৭টি উপাদান রয়েছে। যেমন: প্রোটিন বা আমিষ, শ্বেতসার, তৈল বা চর্বি, ভিটামিন, মিনারেলস বা খনিজ লবণ, আঁশ জাতীয় খাদ্য (মটর, ডাল, শিম, চামড়া সহ ফলমুল, বাদাম ইত্যাদি) ও পানি। সুস্থ্য থাকার জন্য একজন মানুষের সুষম খাদ্যে নিয়মিত ৭টি উপাদান থাকা উচিত। গবেষণায় দেখা গেছে, মানবদেহের সুষ্ঠ গঠন ও রোগ প্রতিরোধের জন্য ভিটামিন, খনিজ পদার্থ, লবণ ও পানি সহ প্রায় ৪০ রকমের বিভিন্ন পুষ্টি উপাদান জরুরী। সুষম খাদ্য কি? তা যেমন অনেক গরিব জনেন না, জানলেও তার সামর্থ থাকে না ক্রয় করার। তেমনি অনেক ধনী ও মনে করেন মাছ-মাংস খেলেই সুষম খাদ্য খাওয়া হল। তাই সুষম খাবার বলতে কি বুঝায় সেটা প্রথমে উল্ল্যেখ করা দরকার। সুষম খাবার সম্পর্কে অনেকের ভুল ধারণা আছে। সেই ভুল ধারণাগুলি প্রথমে নিরসন করা দরকার।

১.   দৈনিক মাংস, আলু বা ভাত এবং দু’রকম শাকসবজি খেলেই সুষম খাদ্য পাওয়া যায়। এটা ভুল। মাংস, আলু বা ভাত, শাকসবজি পুষ্টিকর খাদ্য। সেখানে অবধারিতভাবে আপনার শরীরের প্রয়োজন যথেষ্ট পরিমাণে মিটায় না। আপনি কোন কোন শাক সবজি খাচ্ছেন, তার উপর নির্ভর করে আপনার দৈনিক খাবারে ঘাটতি হচ্ছে কিনা।

২.   যথেষ্ট আমিষ অথবা প্রোটিন পেতে হলে দৈনিক অন্তত একবার মাংস খাওয়া উচিত। এটা ভুল। মাংস ছাড়াই আপনি পুষ্টি পেতে পারেন। আপনার কিছু প্রাণীজাত আমিষ দরকার সেটা আপনি ডিম, দুধ, পনির, মাছ থেকে পেতে পারেন। আপনার বাকি আমিষ আসতে পারে ডাল, শিম জাতীয় বীচি, বাদাম জাতীয় খাবার থেকে। এগুলো নিরাপদ ও সস্তা।

৩.   ওজন কমাতে হলে আপনাকে অবশ্যই রুটি, ভাত, আলু অথবা চর্বি জাতীয় খাবার বাদ দিতে হবে। এটা সত্য নয়। আসল কথা হল আপনাকে সর্বমোট ক্যালরী কমাতে হবে। শাকসবজী থেকে প্রাপ্ত Unsaturated fat সাধারণত: Saturated fat, যেটা Animal Protein থেকে আসে সেটা হার্টের জন্য ভালো। ঘি, মাখন দিয়ে রান্না না করে রাইস বার্ণ অয়েল/সানফ্লাওয়ার/অলিভঅয়েল/তিলের তৈল/ সরিষার  তৈল দিয়ে রান্না করাই উত্তম।

৪.   দৈনিক একটি মাল্টিভিটামিন ট্যাবলেট খেলেই সুষম খাদ্য হয়। আর এটা ও অসত্য ধরণা। ভিটামিন ট্যাবলেট পুষ্টিকর খাবারের বিকল্প হতে পারে না। আপনি যদি সুষম খাদ্য খান তাহলে আপনি সব প্রয়োজনীয় ভিটামিন পেতে পারেন।

৫.   সুষম খাবারের জন্য আপনাকে দৈনিক তিনবার খেতে হবে। এটা ঠিক নয়। আপনি দিনে কতবার খেলেন তা গুরুত্বপূর্ণ বিষয় নয়। গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হল ২৪ ঘন্টার মধ্যে আপনার শরীরের প্রয়োজনীয় ক্যালরী পূরণ হচ্ছে কিনা।

৬.  মাংস এতই প্রিয় যে আমাদের ডায়েটের মধ্যে প্রোটিনের ঘাটতি থাকতে বাধ্য। এটা ও ভাল। শরীরের শক্তির জন্য যে আয়রণ দরকার সেটা দুই আউন্স কিসমিস থেকে পাওয়া যায়। অন্যান্য উৎস হল ডিমের কুসুম, শুকনো মটরশুটি ইত্যাদি। ভিটামিন – এ এর জন্য গাঢ় হলুদ রং এর সবজি যেমন গাজর, মিষ্টি কুমড়া এবং ননীযুক্ত গুড়া দুধ। ভিটামিন- এ  এর অভাব হলে দৃষ্টিশক্তি কমে যায়। চর্মরোগ হয় এবং কোন সংক্রমণ হলে সারতে দেরী হয়। দুধ এবং ছোট মাছে প্রচুর পরিমাণে ক্যালসিয়াম পাওয়া যায়।

৭.   প্রত্যেকের অন্ততঃ দুই গ্লাস ননীযুক্ত দুধ খাওয়া উচিত । এটাও ভুল । আপনার দৈনিক দু’কাপ দই বা দুধ জাতীয় খাবারের প্রয়োজন । তবে এটা ননী যুক্ত হতে হবে এমন নয় । দুধ বা দুধ জাতীয় খাবার হলেও যথেষ্ট ।

৮.  বয়স্ক লোকের সুষম খাদ্যের তেমন প্রয়োজন নেই । এটা ও একটা মারাত্নক ভুল । আপনার বয়স যাই হোকনা কেন সুষম খাবার অত্যন্ত গুরত্বপূর্ণ । বয়স্ক লোকেরা যে দুর্বলতায় বা অসুখে ভোগেন তার মুল কারণ হল অপুষ্টি ।

৯.   সুষম খাবার অ-সুষম খাবারের চেয়ে অধিকতর ব্যয়বহুল । এটাও ভুল ধারণা। যেটা সব চেয়ে বেশী প্রয়োজন সেটা হল খাবারের পুষ্টি মান সম্পর্কে সঠিক জ্ঞান । যেমন –তাজা টমেটোর দাম টিনজাত টমেটো থেকে অনেক কম । গুড়ো দুধের দাম টাটকা তরল দুধের চেয়ে অনেক সস্তা । মনে রাখতে হবে স্বাস্থ সম্মত খাবার তাই যা সুষম খাদ্যের পরিপুরক ।

সুষম খাদ্য (Balanced diet)

সুষম খাদ্য সম্পর্কে এই ভ্রান্ত ধারনা নিরসনের পর এবার সুষম খাবার আসলে কি সেটা উল্লেখ করা যেতে পারে । পুষ্টি বিশারদরা খাদ্য কে চার ভাগে ভাগ করেছেন । যদি আপনি প্রত্যেক ভাগ থেকে সুপারিশকৃত হারে ডায়েট গ্রহন করে থাকেন তাহলে আপনার ডায়েট সুষম হবে । আপনার শরীর গঠন ও মেরামতের জন্য যথেষ্ট প্রোটিন বা আমিষ পাবেন । শক্তির জন্য চর্বি ও শর্করা জাতীয় খাবার পাবেন। মজবুত হাঁড় ও দাঁতের জন্য ক্যালসিয়াম ও অন্যান্য খনিজ পদার্থ পাবেন । শরীরের সাধারণ সুস্থ্যতার জন্য ভিটামিন পাবেন । ওজন বাড়ানো বা কমানোর জন্য খাবারের পরিমাণে তারতম্য করুন। একজন প্রখ্যাত পুষ্টিবিশারদ  Lelord Kordel সকালের খাবারের উপর যথেষ্ট গুরত্ব দিয়েছেন। সকালের খাবার প্রোটিন সমৃদ্ধ শক্তিদায়ক খাবার ও ফলমুল সহ হওয়া উচিত। দুপুরের খাবার হালকা কার্বোহাইড্রেট সহ প্রোটিন সমেত পরিমিত খাবার হওয়া উচিত। রাতের খাবার আরো হালকা প্রোটিন সহ শীম জাতীয় বিচি, সবজি ও ফলমূল খাবেন এবং সন্ধ্যা ৬-৭ টার মধ্যে খাবার শেষ করবেন । কারণ ঘুমানোর আগে অবশ্যই খাবার হজমের সময় দিতে হবে। সবসময় মনে রাখবেন সব মাংস এবং অন্যান্য প্রোটিন সমৃদ্ধ খাবার কমতাপে সিদ্ধ করতে হবে যাতে আমিষ ও ভিটামিন অক্ষুন্ন থাকে। এই প্রসংগে বিখ্যাত পুষ্টি বিশারদ Gayelord Hauser তার বিখ্যাত বই Look Younger, Live longer- এ লিখেছেন এখন থেকে আপনার বাকি জীবনে এই খাদ্যগুলি অন্তর্ভূক্ত করতে ভুলবেন না । আরো প্রোটিন ,আরো খনিজ পদার্থ, আরো কম চিনি এবং যতদুর সম্ভব কম চর্বি । আর খাবারের প্রথমে সালাদ খাবেন । কারন সালাদ শরীরের চর্বি কেটে দেয় । তবে যাদের কাঁচা সবজী খেলে হজমে ব্যাঘাত হয় তাদের হালকা সিদ্ধ করে সবজী খাওয়া উচিত।

তথ্য নির্দেশিকা:

Gayelord Hauser তার বিখ্যাত বই  Look Younger, Live longer (Fault Crest Book Publications)

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *