দধি (Yogurt)

দধি (Yogurt)

দই একটি অতি সুস্বদু খাদ্য । দই দেখলে সবারই জিভে পানি আসে । আমাদের দেশে বিশেষ উপলক্ষে পরিবেশিত খাবারের মধ্যে এটা একটা । প্রীতিভোজে কোর্মা-পোলাও যেমন অপরিহর্য, দইও তেমনি। বিয়ের দাওয়াতে গিয়ে দই মিষ্টি না পেলে অন্যান্য খাবার যতই ভালো থাকুক আমরা খুশি হই না । তই যে উপকারী খাবর সেটাও আমরা সাধারনভাবে জানি। পেটের অসুখে আমরা এটা খেয়ে থাকি। কিন্তু এর খাদ্যমূল্য সম্বদ্ধে অনেকেরেই স্পষ্ট ধারনা নেই। পুষ্টিবিদরা দইকে একটি অতি উত্তম খাদ্য (Wonder Food) বলে অভিহিত করেছেন। শুধু বিশেষ উপলক্ষ্যে বা পেটের অসুখে নয় , প্রতিদিনই দই খাওয়া উচিত।

পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে দই এর যে নাম দেওয়া রয়েছে সেটা লক্ষনীয়। আর্মোনিয়ানরা দইকে  Matazoon বলে। যুগোশ্লাভিয়ারা এর নাম দিয়েছে Kissclomleko,  রাশিয়ানরা দইকে Varenetz বলে। ফরাসীরা বলে Yogurt, সার্ভিনিয়াতে দইকে Gioddu বলা হয়। মিশরে একে Labenraib বলে। এই শব্দগুলোর প্রতেকটির অর্থ দীর্ঘকীবন (Long life) । বস্তুতঃ দই দীর্ঘজীবি হতে সাহায্য করে । বুলগেরিয়ার লোকেরা সাধারনতঃ দীর্ঘজীবি হয় এবং বৃদ্ধ বয়সেও তারা যৌবনোচিত শক্তি- সামর্থ্যের জন্য সপরিচিত। তিই তাদের খাদ্যের একটা প্রধান অংশ। দই খাওয়ার জন্য তার দীর্ঘজীবি হয় এটা বলা যায় না । জলবায়ু, বংশগতি এবং অন্যান্য কারণ রয়েছে তদের দীর্ঘ জীবনের পেছনে। তবে দই এর গুনাবলী বিবেচনা করলে এটা যে অন্যতম কারণ তাতে সন্দেহ নেই।

দধি (Yogurt)

দই এর কী কী গুণ আছে? দই একটি দুগ্ধজাত খাদ্য; তাই দুধের সব খাদ্যমূল এর মধ্যে আছে। তা যদি হয়, তাহলে দুটোর মধ্যে তফাৎ কী? দুধের পরিবর্তে দই খাওয়ার সুবিধাটি কী? কেনই বা দইকে Wnder Food  বলা হয়? উভয়ের মধ্যে প্রোটিন বা আমিষ আছে, কিন্তু দই এর প্রোটিন অতি সহজে হজম হয়। দই এর মধ্যে এক রকমের জীবাণু আছে তাকে lactobacillus bulgaricus বলে। এই জীবাণু আমাদের পাকস্থলীর মধ্যে স্থায়ীভাবে বাস করে। দই এর মাধ্যমে এগুলো সেখানে ঢুকানো সম্ভব। এই জীবাণু দুধের মধ্যে যে lactose (milk sugar) থাকে সেটাতেরাসায়নিক পরিবর্তন এন lactic acid তৈরি করে এবং দুধের প্রোটিনকে ভেঙ্গে peptone এবং amino acid  এ পরিণত করে। ফলে দই এর প্রেটিন সহজে হজম হয়। সে জন্য পেটের অসুখে দই খেলে কোন ক্ষতি হয় না, কিন্তু দুধ খেলে হয়তবাঅসুবিধে হতে পারে। দুধের চেয়ে দই এর আরো একটা বড় সুবিধা হলো এই যে tubercle এবং anthrax bacilli ছাড়া অন্যান্য ক্ষতিকর জীবাণু ২৪ ঘন্টার মধ্যে দই এ মারা যায়। তাই দই আমাদের রোগ আক্রমণের হাত থেকে রক্ষা করে। l দই এর জীবাণু আমাদের পরম বন্ধুর মত কাজ করে।

দই এর মধ্যে প্রচুর ক্যালসিয়াম আছে। ক্যালসিয়াম আমাদের শরীরের জন্য বিশেষ প্রয়োজন। ক্যালসিয়াম ও ফসফরাস দাঁত ও হাঁড়কে শক্ত করে । বৃদ্ধদের ক্যালসিয়ামের বেশী প্রয়োজন হয়। কারণ , বয়সের সঙ্গে সঙ্গে হজম শক্তি কমে আসে এবং দাঁত না থাকায় খাবার ভাল করে চিবানো সম্ভব হয় না। ফলে শরীরের কাজে লাগানোর মত ক্যালসিয়ামের অভাব হয়। পড়ন্ত বয়সেও ক্যালসিয়াম দরকার। রক্তে ক্যালসিয়াম কমে গেলে মেজাজ খিটখিটে হয়। এই প্রয়োজনীয় জিনিসটি অন্যান্য খাবারে ও আছে , যেমন শাক-সবজির মধ্যে। কিন্তু শাক-সবজির মধ্যে আঁশ (fibre) থাকায় ভাল করে না চিবালে বাহজম শক্তি কম থাকলে সেটা শরীরের কাজে লাগে না। এদিক দিয়ে দই এর ক্যালসিয়ামের একটা সুবিধা এই যে, এর মধ্যে জীবাণু রয়েছে সেটা আমাদের অন্ত:নালীর (intestine) মধ্যে ভিটামিন-বি তৈরি করে। শরীরকে রোগের হাত থেকে রক্ষা এবং সুস্বাস্থের জন্য বি- ভিটামিনগুলো অপরিহার্য। দুঃখের বিষয়, খাবারের মধ্যে এই ভিটামিনগুলো খুব বেশী পরিমানে থাকে না। ভিটামিন –এ এবং সি যত সহজে কয়েকটা খাবার থেকে পাওয়া যায়, বি- ভিটামিন সেভাবে পাওয়া যায় না। দই- এর জীবাণু এই দুষ্পাপ্য ভিটামিনগুলো তৈরি করে, তাই প্রতিদিনই দই খাওয়া উচিত। দই-এর এসব গুনাবলীর কথা চিন্তা করলে একথা জোর দিয়েই বলা যায় যে, নিয়মিত দই খেলে দীর্ঘজীবি হউন বা না হউন , শরীরের উপকার হবেই।

এখন প্রশ্ন হলো রোজ দই খাওয়া কি সম্ভব এই দুর্মূল্যের বাজারে? এ অবস্থায় রোজ দই খাওয়ার উপদেশ অবাস্তব নয় কী? আমি বলি দই কিনে খাবেন না। বস্ততঃ এদেশে কোন  তৈরী খাবর কিনে খাওয়া স্বাস্থ্যের পক্ষে বিপদজনক। কারণ খাবর অস্বাস্থ্যকর পরিবেশে তৈরি করা হয় এবং খোলা অবস্থায় বিক্রি করা হয় । তাই টাকা দিয়ে (যদি আপনার কেনার টাকা থাকেও) দই কিনে খাবেন না। দুধ বাসি হতে পারে , পাত্র অপরিষ্কার হতে পারে এবং অস্বাস্থ্যকর পরিবেশে সেটা বসানো হতে পারে। দই- এ মাছি বা তেলাপোকা পড়লে ফেলে দিয়ে বিক্রি করতে এদেশে কেউ দ্বিধা করে না । তাই বলছিলাম দই কিনে খাবেন না । তাহলে কোথায় পাওয়া যাবে? দই বাড়ীতে তৈরী করা সম্ভব এবং এটা কোন কঠিন কাজ নয়। যে কেউ বাড়ীতে এটা তৈরী করতে পারেন। কিভাবে করবেন শুনুনঃ

গরুর দুধের সঙ্গে কিছুটা গুড়া দুধ মেশাবেন। শুধু গরুর দুধে দই ভাল হয় না যদি না আপনি দুধটাঅনেকক্ষন জ্বালিয়ে দুধের মধ্যে যে পানি থাকে সেটা কিছুটা কমিয়ে না ফেলেন। এই দুর্মূল্যের বাজারে দুধ কেনাই মুশকিল। তাই এক লিটার দুধ জ্বালিয়ে কমিয়ে আধ লিটার করার প্রশ্ন ওঠে না। সেজন্য বলছিলাম কিছুটা গুড়া দুধ মেশাবেন।এত দুধটা ঘন হবে। আর দুধ ঘন না হলে দই ভালভাবে জমে না। তারপর দুধটা গরম করবেন। ফোটাবর দরকার নেই- গরুর দুধটা অবশ্যই আগেই ফুটানো আছে ধরে নিচ্ছি। গুড়া মেশানো দুধটা কী পরিমাণ গরম করতে হবে সেটা জানা খুবই প্রয়োজন। খুব বেশী বা খুব কম হলে দই বসবে না। এক ফোঁটা দুধ হাতের তালুতে নিয়ে দেখবেন। গরম বোধ হওয়া উচিত; কিন্তু হাত পুড়ে যাওয়ার মত গরম যেন না হয়। এই গরম  দুধে সামন্য চিনি দেবেন। খুব বেশী চিনি দিলে দই জমবে না। এরপর আগের তৈরি বা বাজারে কেনা এ ক্ষেত্রে অবশ্যই বাধ্যতামুলক ভাবে দই এর খানিকটা বীজ ভাল করে নেড়ে দুধের মধ্যে মিশিয়ে দেবেন। কতটা বীজ দেবেন সেটা দুধের উপর নির্ভর করে । বেশী দিলে দই টক হয়ে যাবে, কম দিলে  দই হবে না বা হতে অনেক দেরী হবে। কয়েকদিন করার পর পরিমাণটা আপনি নিজেই বুঝতে পারবেন। যা হোক বীজটা ভাল করে দুধে মিশিয়ে দেওয়ার পর পাত্রটিতে ঢাকনি দিয়ে ঢেকে তার উপর গরম কাপড় দিয়ে রাখবেন। গরমের সময় কোন অসুবিধা হয় না; তাড়াতাড়ি দই বসে কিন্তু শীতের সময় সহজে জমতে চায় না। শীতকালে কাপড় দিয়ে ঢেকে রোদে রাখাই ভাল।

বিদেশে দই তৈরীর মেশিন (electric yogurt maker)  পাওয়া যায়। ইদানিং আমাদের দেশে এটা শপিংমল গুলিতে পাওয়া যাচ্ছে। এটা দিয়ে অতি সহজে দই তৈরী করা যায়। আপনার যাদি মেশিন নাও থাকে , তাহলে দিই বানাতে পারবেন না, তা নয়। শীতকালে যদি আপনি বাসায় রোদনা পান এবং গরম কাপড় দিয়ে ঢাকার পরও আপনার দই না বসে, তাহলে আপনি দই এর পাত্রটি গরম পানির মধ্যে বসিয়ে রাখবেন। ৪/৫ ঘন্টার মধ্যে দই তৈরি হওয়ার কথা । তাপ কম থাকলে আরো বেশী সময় লাগতে পারে। দই জমে গেল ফ্রিজে রেখে দেবেন। ঠান্ডাহলে খাবেন। যাদের ফ্রিজ  নেই তারা বেশীক্ষণ দধি বাহিরে রাখবেন না। দই-এর বীজ খানিকটা রেখে দেবেন আবার বসানোর জন্য। এইভাবে দই তৈরি করতে অতিরিক্ত কোন খরচ নেই। আপনি দুধের দামেই দই পেয়ে যাবেন। আপনার পরিবারের দৈনিক খাবারের সঙ্গে এট্ হবে একটা মূল্যবান সংযোজন।