অ্যাজমা (Ezma)

সমকালিন কয়েকটি মরণঘাতি রোগ

গ্রিক ভাষায় অ্যাজমা শব্দের অর্থ হলো হা করে শ্বাস নেওয়া। গ্রিক চিকিৎসক হিপোক্রেটিস সর্বপ্রথম অ্যাজমা শব্দটি ব্যবহার করেন। অ্যাজমা বা হাঁপানি হলো এমন একটি শারীরিক অসুস্থতা যার দ্বারা সব বয়সের লোকজন আক্রান্ত হতে পারে। আক্রান্ত রোগীর ফুসফুসের শ্বাসনালি সাধারণ লোকজনের শ্বাসনালির তুলনায় অনেক বেশি স্পর্শকাতর অর্থাৎ সামান্য কারনেই শ্বাসনালি খিঁচুনি দেয়। অ্যাজমা রোগীর শ্বাসনালি অতিমাত্রায় সংবেদনশীল। এ জন্য কোনো উত্তেজক যেমন – ধুলাবালি, পশুপাখির স্পর্শ, ঠান্ডা, ফুলের রেনু ইত্যাদির সংস্পর্শে এলে এদের শ্বাসনালি হঠাৎ সংকুচিত হয়ে তীব্র শ্বাসকষ্টের সৃষ্টি করে। এ রোগ কখনোই নির্মুল করা যায় না। তবে সম্পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ করা যায়। পুরো বিশ্বে প্রায় ৩০০ মিলিয়ন মানুষ এ রোগে ভুগছেন। অ্যাজমা রোগের ইতিহাস পরযালোচনা করলে দেখা যায় এ ধরণের রোগীদের বংশগত অ্যাজমা রোগের প্রকোপ থাকে। অ্যাজমা রোগের প্রধান উৎস হলো অ্যালার্জি জনিত রোগ। তাই এ রোগ প্রতিরোধের প্রধান উপায় হচ্ছে অ্যালার্জি থেকে দূরে থাকা। ধুলাবালি, ঠান্ডা, বা গরম আবহাওয়া, বিভিন্ন ধরনের খাবারের মাধ্যমে একজন লোক সহজেই আক্রান্ত হতে পারেন।

অ্যাজমার ধরনসমূহ : ১. দম বন্ধ অনুভুত হওয়া, ২. শ্বাস নিতে কষ্ট হওয়া, ৩. বুকের ভিতর বাঁশির মতো শাঁ শাঁ শব্দ অনুভব করা। ৪. বুক ভরে শ্বাস নিতে না পারা। ৫. অল্প পরিশ্রম করলে রোগী হয়রান/ক্লান্ত অনুভব করা।

কিছু তথ্য : পরিবেশের যেসব উপাদানে অ্যাজমা লক্ষণ গুলো প্রকাশ পায় তাকে অ্যালার্জেন বা উত্তেজক বলে। নিন্মোক্ত কারণে অ্যালার্জি হয়ে থাকে। ১. পোষা প্রাণী। ২. পশু পাখির লোম। ৩. ধুলাবালি বিশেষ করে ঘরের মাইট। ৪. ধুমপান। ৫. পোকামাকড়। ৬. ফুলের রেনু। ৭. আবেগ/টেনশন। ৮. ঠান্ডা আবহাওয়া। ৯. কিছু খাবার, যেমন – বেগুন, পুইশাক, চিংড়ি, ইলিশমাছ, গরু, পাকা কলা, হাঁসের ডিম ইত্যাদি। ১০. কিছু ব্যথানাশক ঔষধ। শুধু এগুলো উপাদান দ্বারাই অ্যাজমা হবে এমন কোনো কথা নেই। প্রত্যেকের অ্যালার্জেন আলাদা আলাদা হয়ে থাকে। অ্যাজমা যেহেতু প্রধানত অ্যালার্জি জনিত রোগ তাই এরোগ প্রতিরোধের প্রধান উপাদান হচ্ছে অ্যালার্জি থেকে দূরে থাকা। এ ব্যপারে বাবা-মাকে প্রধান ভূমিকা পালন করতে হবে। কোন জিনিসটাতে শিশুর অ্যালার্জিন পরিমান বাড়ছে বাবা-মাকে তার খেয়াল করতে হবে। এক্ষেত্রে ঔষধের সাহায্য নেওয়া যেতে পারে। ট্যাবলেট, সিরাপ বা ইনহেলারসহ যে কোনো ঔষধ ডাক্তারের পরামর্শ অনুযায়ী গ্রহণ করতে হবে।

শ্বাসকষ্ট : শ্বাসনালির ভিতর দিয়ে স্বাভাবিক অবস্থায় বাতাস সহজেই আসা-যাওয়া করতে পারে। যখন কোনো অ্যালার্জেন বা উত্তেজক জিনিস রোগীর শরীরে প্রবেশ করে তখন অসংখ্য হাজার ক্ষুদ্র শ্বাসনালিগুলোর মাংসপেশি সংকুচিত হয়। ফলে এই শ্বাসনালিগুলো সরু হয়ে যায়। অ্যালার্জির প্রভাবে শ্বাসনালির গ্রন্থি থেকে ভারী মিউকাস পদার্থ বের হয় যাকে আমরা কফ বলি। রোগীর শ্বাস নেওয়ার শেষে পুনরায় শ্বাস ফেলতে বেশি কষ্ট হয়। আর সরু শ্বাসনালি দিয়ে বাতাস যাওয়া আসার সময় বাঁশির মতো সরু হয়। তখন মিউকাস জাতীয় আঁঠালো কফের কারণে অনবরত কাশি হতে থাকে। কখনো কখনো শ্বাসনালি এত সরু হয় যে, বাতাস বায়ুথলিতে পৌছায় না, তখন শরীরে অক্সিজেনের পরিমাণ কম থাকে। এ অবস্থাকে বলা হয় মারাত্মক জটিল অ্যাজমা বা সিভিয়ার অ্যাকিউইট অ্যাজমা। এ অবস্থায় বেশিক্ষন স্থায়ী হলে অক্সিজেনের অভাবে বা কার্বন ডাই-অক্সাইড অতিরিক্ত হওয়ার কারণে রোগীর মৃত্যু ঘটাতে পারে।

বাড়ছে শ্বাসনালির অ্যাজমা

বিশ্বের প্রায় ১০ কোটি লোক শ্বাসনালির অ্যাজমায় আক্রান্ত হয়। এদের ৯০% এরও বেশি অত্যাধুনিক চিকিৎসা পায় না এবং অনেক রোগী মারা যায়। যদিও এ মৃত্যুর  ৮০% প্রতিরোধ সম্ভব যদি আধুকি চিকিৎসা ও ডাক্তারের তদারকির মাধ্যমে অ্যাজমা নিয়ন্ত্রনের শিক্ষা দেওয়া যায়। অ্যাজমা বা হাঁপানি আসলে শ্বাসনালির অসুখ। যদি কোনো কারণে শ্বাসনালিগুলো অতিমাত্রায় সংবেদনশীল হয়ে পড়ে এবং বিভিন্ন ধরনের উত্তেজনায় উদ্দীপ্ত হয় তখন বাতাস চলাচলের পথে বাধার সৃষ্টি হয়ে শ্বাস নিতে কষ্ট হয়।

কাদের হতে পারে হাঁপানি : যেকোনো বয়সের স্ত্রী, পুরুষ, শিশু-কিশোর যে কারও হতে পারে। যাদের রক্তের সম্পর্কের আত্মীয়দের হাঁপানি আছে তাদের এ রোগ হওয়ার আশঙ্কা প্রবল। আবার দাদা-দাদির থাকলে (বাবা-মায়ের না থাকলেও) নাতি নাতনি বা ছেলেমেয়েরা এ রোগে আক্রান্ত হতে পারে। মাতৃকুল থেকে হাঁপিানিতে আক্রান্ত হওয়ার  সম্ভাবনা বেশি।

অ্যাজমা কি ছোঁয়াচে : না, অ্যাজমা ছোঁয়াচে রোগ নয়। পারিবারিক বা বংশগতভাবে অ্যাজমা হতে পারে। কিন্তু ছোঁয়াচে নয়। অ্যাজমায় আক্রান্ত মায়ের বুকের দুধ খেয়ে শিশুদের অ্যাজমায় আক্রান্ত হওয়ার আশঙ্কা নেই। মায়ের সংস্পর্শ থেকেও হওয়ার আশঙ্কা নেই।

অ্যাজমা রোগের প্রধান উপসর্গ বা লক্ষণ গুলো হলো: বুকের ভিতর বাঁশির মতো শাঁ শাঁ আওয়াজ। শ্বাস নিতে  ও ছাড়তে কষ্ট। দম খাটো অর্থাৎ ফুসফুস ভরে দম নিতে হবে। রাতে ঘুম থেকে উঠে বসে থাকা।

চিকিৎসা : রক্তের বিশেষ পরীক্ষা ও বুকের এক্সরে। স্কিন প্রিক টেস্ট; রোগীর চামড়ার ওপর বিভিন্ন এলার্জেন দিয়ে পরীক্ষা করা হয় এবং এই পরীক্ষাতে কোন জিনিসে রোগীর অ্যালার্জি আছে তা ধরা পড়ে।

এলার্জেন পরিহার : হাঁপানির হাত থেকে মুক্তি পাওয়ার সবচেয়ে সহজ পন্থা হলো যে জিনিসে অ্যালার্জি তা যতদূর সম্ভব এড়িয়ে চলা। তাই অ্যাজমা রোগীদের প্রথমেই অ্যালার্জি পরীক্ষা করে জানা দরকার তার কিসে কিসে অ্যালার্জি হয়।

ঔষধ প্রয়োগ : অ্যালার্জি দ্রব্যাদি এড়িয়ে চলা ও ঔষধের পাশাপাশি ভ্যাকসিন ও অ্যাজমা রোগীদের সুস্থ থাকার অন্যতম চিকিৎসা পদ্ধতি। আগে ধারণা ছিল অ্যাজমা একবার হলে আর সারে না। কিন্তু বর্তমানে চিকিৎসা ব্যবস্থাপনার যথেষ্ট উন্নতি হয়েছে। প্রথম দিকে ধরা পড়লে অ্যালার্জি জনিত অ্যাজমা রোগ একেবারে সারিয়ে তোলা সম্ভব। মনে রাখতে হবে প্রতিকারের চেয়ে প্রতিরোধ উত্তম।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *