উচ্চ রক্তচাপ (HighBlood Pressure)

সমকালিন কয়েকটি মরণঘাতি রোগ

ক্রনিক রোগগুলোর মধ্যে এটি হলো উচ্চ রক্তচাপ। প্রথমে রক্তচাপ কী এ সম্বন্ধে একটা ধারণা দেয়া দরকার। জন্ম থেকে মৃত্যু পর‌্যন্ত হৃৎপিন্ড ক্রমাগত রক্ত পাম্প করে যায়। এর ফলে রক্ত ধমনীর গায়ে চাপ পড়ে। এই চাপকে রক্তচাপ বা blood pressure বলা হয়। ডাক্তাররা একটি mercury- যুক্ত যন্ত্রের সাহায্যে এই চাপের মাত্রা পরীক্ষ করেন। যন্ত্রটি হাতে লাগিয়ে পাম্প করলে চাপ উপরে উঠে যায়। এইভাবে যে রিডিংটা পাওয়া যায় সেটা systolic pressure বলে। পাম্পে ধীরে ধীরে চাপ ছেড়ে দিলে রক্তের চাপ কমে যায়। তখন যে রিডিংটা পাওয়া যায় সেটাকে diastolic pressure বলে। একজন পূর্ন বয়স্ক ব্যক্তির আদর্শ রক্তচাপ হওয়া উচিত ১২০/৮০ মিলিমিটার। Systolic pressure 120, diastolic pressure-80। তবে ১৪০/৯০ মিলিমিটার পর্যন্ত চাপ স্বাভাবিক ধরা হয়। যদি রক্তচাপ এর উপরে উঠে যায় এবং সেই মাত্রায় কিছু দিন অবস্থান করতে থাকে , তাহলে সেটা উচ্চ রক্ত চাপ mild বা মৃদ্যু হতে পারে অথবা severe মারাত্মক হতে পারে। এ অবস্থায় কী করনীয় সেটা নীচে আলোচনা করা হলো। তবে উচ্চ রক্তচাপ সম্বন্ধে অনেকের ভূল ধারনা আছে। প্রথমেই সেই ভুল ধারণাগুলো উল্লেখ করা হলো।

১।      উচ্চ রক্তচাপের চিকিৎসা রোগটির চেয়ে অনেক খারাপ। উচ্চ রক্তচাপ সম্বন্ধে এটি সবচেয়ে ক্ষতিকর ধারণা। উচ্চ রক্তচাপ কেন হয় আমরা ঠিক জানি না, কিন্তু সহজে অস্বস্তি না ঘটিয়ে এবং অল্প খরচে অধিকাংশ রোগীকে চিকিৎসা করানে যায়। বর্তমানে খুবই কার্যকরী ঔষুধ দিয়ে তেমন কোন পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া ছাড়াই উচ্চ রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণ করা যায়।

২।     মৃদু উচ্চ রক্তচাপ চিকিৎসা করার দরকার নেই। এদিন এক ভদ্রলোক তার ডাক্তারের অফিসে এলেন তার বয়স ৪৭। তার উচ্চ রক্তচাপের পরিমান ছিল ১৪৫/৯৫-খুব বেশী উচ্চ রক্তচাপ নয় এবং এমন আওতায় মধ্যে যেটা চিকিৎসা করানো উচিত ছিল । কিন্তু তিনি কোথাও পড়েছেন যে মৃদ্যু রক্তচাপ নিয়ে মাথা ঘামানোর কোন প্রয়োজন নেই যদি আপনি সুস্থ্য বোধ করেন। তিনি ক্ষতিকারক ঔষধ থেকে দূরে থাকতে চান এবং ডাক্তরের  পরামর্শ উপেক্ষা করে ঔষধ খেতে রাজি হননি। পাঁচ বছর পরে তার উচ্চ রকাতচাপ তখন দাঁড়িয়েছে ১৫৫/১০৫। এই ধরনের উচ্চ রক্তচাপ খুব বিপদ জনক ছিল না, কিন্তু দেখা গেল তার কিডনী ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে, তার হৃৎপিন্ড প্রসারিত হয়েছে। সুখের বিষয় , তিনি ঔষধ খেতে রাজি হলেন। Diuretic এবং beta blocker নামক ঔষুধ, ছয় মাস খাওয়ার পর তার রক্তচাপ কমে গেল, তার প্রসারিত হৃৎপিন্ড সঙ্কুচিত হলো এবং তার কিডনীর কার্যকারিতা স্বাভাবিক হয়ে আসলো। এ থেকে যে সহজ সত্যটা বেরিয়ে আসলো তা হলো উচ্চ রক্তচাপ মৃদু হোক, আর মারাত্মক হোক, চিকিৎসা করা উচিৎ। কোন কোন লোকের শুধু ওজন কমানো দরকার , খাবারে লবনের পরিমান কমানে দরকার এবং ব্যায়াম করা দরকার। অন্যদের মৃদু রক্তচাপের জন্য দৈনিক একটা পিল এবং অস্বাভাবিক উচ্চ রক্তচাপের জন্য দৈনিক ২০টা পর্যন্ত খেতে হতে পারে।

৩।     একজন প্রাপ্ত বয়ষ্ক লোকের ক্ষেত্রে ১২০/৮০ মাত্রার রক্তচাপ আদর্শ বলে মনে করা হয় এবং ১৪০/৯০ মাত্রার রক্তচাপকে স্বাভাবিক বলে মনে করা যেতে পারে। প্রায় ৭০ ভাগ উচ্চ রক্তচাপ রোগী ১৪০/৯০ থেকে ১৬০/১০৪ পরিমানের মধ্যে পড়েন। আর অন্যরা ১৬০/১০৫ থেকে ১৮০/১১৫ এই রেঞ্জের অন্তর্ভুক্ত। মারাত্মক রক্তচাপ (২২০/১১৬) অথবা এর বেশী বিরল। কারণ মৃদু অথবা moderate রোগীকে কার্যকরীভাবে চিকিৎসা করা যায়।

৪।      কেবল যারা টেনশন এবং দুঃশ্চিন্তায় ভোগেন তারাই রক্তচাপে আক্রান্ত হন। উচ্চ রক্তচাপ মানে রক্ত ধমনীতে অত্যধিক চাপ বুঝায়, রোগীর ব্যক্তিত্ব বুঝায় না। অনেক শান্তশিষ্ট ব্যক্তি উচ্চ রক্তচাপের শিকার হতে পারেন এবং অনেক ব্যক্তিআছেন যারা উদ্বিঘ্ন স্বভাবের মানুষ যাদের রক্তচাপ স্বভাবিক। তবে টেনশন, উদ্বেগ রক্তচাপ বাড়িয়ে দিতে পারে ।

৫।     বয়স্ক ব্যক্তিদের রক্তচাপ বেশী হওয়া দরকার, যাতে তার মস্তিকে এবং অন্যান্য গুরত্বপূর্ন অঙ্গ  প্রত্যঙ্গে যথেষ্ট পরিমাণ রক্ত পেতে পারে। অসংখ্য গবেষণায় প্রমাণিত হয়েছে যে, স্বাভাবিক রক্তচাপের বয়স্ক ব্যক্তিরা যাদের রক্তচাপ একটু সামান্য বেশী, তারা কম স্ট্রোক এবং গৃদরোগে আক্রান্ত হন। উচ্চ রক্তচাপ বয়স্ক ব্যক্তিদের মস্তিকের ক্ষমতা বৃদ্ধি করে, এমন কোন প্রমাণ নেই। বস্তুতঃ ফলটা উল্টো হতে পারে- অথবা মিনি স্ট্রোকের সম্ভাবনা বাড়িয়ে দিতে পারে।

৬।     উচ্চ রক্তচাপ বয়স্কদের মধ্যে বেশী দেখা যায়। ৫৫ থেকে ৬০ বা বেশী বয়স্ক না হলে ধরা নাও পড়তে পারে, কিন্তু গবেষনায় দেখা গেছে বেশীর ভাগ ক্ষেত্রে ৩০ থেকে ৪৫ বছর বয়সের মধ্যে এই রোগের উৎপত্তি হয়।

৭।      উচ্চ রক্তচাপ নিশ্চিতভাবে চিহ্নিত করতে হলে ডাক্তারদের অনেকগুলো পরীক্ষা নিরীক্ষা করতে হয়, যেমন Elementary blood pressure monitoring exercise,stress, tests and echo-cardiogram; বিপুল সংখ্যক ক্ষেত্রে এই সব পরীক্ষা – নিরীক্ষার কোন প্রয়োজন নেই। কতগুলো সহজ রক্ত পরীক্ষা , মুত্র পরীক্ষ এবং কিছু দিন যাবৎ রক্তের চাপ মেপে একটি সার্থক রোগ নির্নয় করা যেতে পারে।

৮।     উচ্চ রক্তচাপে খাবরের ব্যাপারে খুব কড়াকড়ি আরোপ করা হয়। যেখানে ঔষধ ছাড়া ওজন কমোনোটাখুব জরুরি সেখানে খাদ্যের ব্যাপারে কড়াকড়ি করার কোন  প্রয়োজন নেই। এক মহিলার ওজন ৪০ পাউন্ড বেশী, যখন তিনি ডাক্তারের কাছে এলন মৃদ্যু রক্তচাপের কারনে। এর এক বছর পর তার পারিবারিক চিকিৎসক একটি ছাপানো খাদ্য তালিকা দিয়েছিলেন এবং লবণাক্ত খাদ্য এড়িয়ে চলতে বলেছিলেন। মহিলার শখ ছিল রান্না করা ও অতিথি  আপ্যায়ন করা। তিনি তাদের অনেক কিছু রান্না করে খাওয়াতেন, কিন্তু নিজে বহু কস্টেলোভ সংবরণ করে থাকতেন। কিন্তু বেশী দিন থাকতে পারেন নি। লোভের কাছে তিনি পরাজিত হলেন এবং ইচ্ছমতো খেতে শুরু করলেন।

তার রক্তচাপ কমানোর জন্য ডাক্তার একজন পুষ্টিবিশারদকে মহিলার জন্য একটি খাদ্য তালিকা তৈরি করার জন্য অনুরোধ করলেন। এই খাদ্য তালিকায় মহিলার প্রিয় খাবারগুলো ছিল, কিন্তু সেগুলোতে চর্বি এবং লবণ কম ছিল । এই সাথে ডাক্তার তাকে দৈনিক আধ ঘন্টা দ্রুত হাঁটার জন্য উৎসাহিত করলেন । তিন মাসের  মধ্যে মহিলার ওজন ১২ পাউন্ড কমে গেল এবং রক্তচাপও কমে গেল। এক বছরের মধ্যে তার প্রেসার স্বাভাবিক হয়ে এলো এবং তার ওজন ৩০ পাউন্ড কমে গেল। সব রোগীকে এই মহিলার মত চিকিৎসা দেয়া যাবে না। কিন্তু অধিকাংশ লোক চর্বিযুক্ত খাবার অর্ধেক কমিয়ে এনে এবং আরো ফলমূল , সবজি এবং কম শর্করা বিশিষ্ট খাবার দিয়ে নতুনভাবে জীবন শুরু করতে পারেন।

৯।     আপনি রোগ প্রতিরোধ করতে পারেন এবং আয়ু বাড়াতে পারেন, যদি আপনি জোরে সোরো ব্যায়াম করেন। নিয়মিত ব্যায়ামে হৃৎপিন্ডের কম্পন ক্ষমতা বাড়ে। এটা প্রমানিত যে নিয়মিত হালকা ব্যায়ামের হৃদরোগের ঝুঁকি কমে যায়। নিতম্ব এবং হাঁটুর উপরে যে চাপ পড়ে ব্যায়ামে তা পড়ে না। নিয়মিত হালকা ব্যায়ামের সাথে কম লবণাক্ত এবং কম ক্যলরিযুক্ত খাবার, মৃদু ও মাঝারি রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণের জন্য একটি গুরত্বপূর্ণ প্রথম পদক্ষেপ। গবেষণায় দেখা গেছে এভাবে ১৫ থেকে ২৫ ভাগ রোগীর রক্তচাপ স্বাভাবিক হয়ে আসে। দৈনিক ২০ থেকে ৩০ মিনিট দ্রুত হাঁটাহাটি একটি আদর্শ ব্যায়াম। এটা প্রত্যেকের দৈনন্দিন কার্মকান্ডের মধ্যে অন্তুর্ভুক্ত করা কঠিন নয়।

১০।    যারা দীর্ঘদিদন ধুমপান করেছেন তারা তাদের হৃৎপিন্ডের অপরিবর্তনীয় (Irreversible) ক্ষতি করেছেন। তাই ধুমপান ছেড়ে দিলে তাদের কোন লাভ হবে না: প্রমাণ আছে যে হৃৎপিন্ডের ক্ষতি ছাড়াও ধূমপানে রক্তচাপ বেড়ে যায়। কিন্তু আপনি যদি ২০ বছর যাবৎ দৈনিক ২ থেকে ৩ প্যাকেট সিগারেট খেয়ে থাকেন তবুও ধুমপান ছেড়ে দিলে এক বা দু বছরের মধ্যে আপনার হৃদরোগে আক্রান্ত হয়ে হঠাৎ মারা যাওয়ার ঝুঁকি কমে যাবে। আপনি অধূমপায়ীদের পর্যায়ে পড়বেন। যে ব্যক্তি গত ১৫ বছরের দৈনিক ১০ থেকে ২০ প্যাকেট সিগারেট খেয়েছেন তিনি এই লক্ষ্যমাত্রা অর্জন করবেন এক বছরের কম সময়ে।

১১।    Meditation বা ধ্যান অথবা অন্যান্য ঔষধবিহীনচিকিৎসা জাক্তারী চিকিৎসার মতই কার্যকর এবং অনেক বেশী নিরাপদ: কয়েক মিনিট ধ্যান করলে আপনার মনোনিবেশ করার ক্ষমতা বেড়ে যেতে পারে। ঝামেলাপূর্ণ অবস্থা মোকাবেলা করতে পারেন, কিংবা কোন কঠিন কাজ নতুন উদ্যোমে শুরু করতে পারেন। কিন্তু অধিকাংশ রক্তচাপ রোগীর জন্য এই সব টেকনিকের ফলাফল সাময়িক যদি আপনার রক্তচাপ স্বাভাবিকের চেয়ে সামান্য বেশী: ১৪০-১৫৫ বাই ৯০-৯৫ এই রেঞ্জেরমধ্যে পড়ে তাহলে ঔষধের পরিবর্তে টেকনিকের ব্যবহারে কয়েক বৎসরের জন্য কোন বড় ধরনের বিপদ নেই। কিন্তুযাদের রক্তচাপ মারাত্মক পর্যায়ে আছে অথবা রক্তচাপ জনিত অঙ্গপ্রত্যঙ্গের জটিলতার ভুগছেন তাদের পক্ষে ঔষুধের বিকল্প হিসেবে এটা কে গ্রহণ করা ঠিক হবে না। সেদিন আর নেই যখন ডাক্তারের কাছে আপনার স্বাস্থ্য রক্ষার দায়িত্ব ছেড়ে দিতে পারতেন। আজকের দিনে রোগীদের চিকিৎসায় তার নিজের একটা দায়িত্ব আছে। এই কথা উচ্চ রক্তচাপের ক্ষেত্রে বেশী করে সত্য, কারণ এই রোগ হলে দীর্ঘ জীবন এবং কর্মক্ষমতা লাভ করতে রোগীকে সচেতন থাকতে হবে।

১২।   উপরোক্ত মতামত একজন বিশেষজ্ঞ ডাক্তারের। তার মোদ্দা কথা হলো উচ্চ রক্তচাপের কোন সঠিক কারণ জানা যায় নি। অনেকের ধারণা যারা না কর্মকান্ডে জড়িত থাকেন এবং উদ্বেগ উৎকন্ঠায় ভোগেন তারাই কেবল এ রোগে আক্রান্তহন এবং যারা শান্ত-শিষ্ট তাদের এ রোগ হয় না। উক্ত বিশেষজ্ঞ বলেছেন এ ধারনা ঠিক নয়। তিনি আরো বলেন যে, উচ্চ রক্তচাপ হলে অভিজ্ঞ ডাক্তারের প্রেসক্রিপশন অনুযায়ী নিয়মি ঔষধ খেলে তা নিয়ন্ত্রণ করা যায়। ধ্যান বা  Meditation অথবা অন্য কোন ঔষধবিহীন টেকনিক সাময়িক উপশম দিতে পারে কিন্ত এ সব কোন স্থায়ী সমাধান নয়। যারা ঔষধ বাদ দিয়ে এ সবের উপর নির্ভর করেন তারা মারাত্মকবিপদের ঝুঁকি নিচ্ছেন। তারাহৃদরোগের বা স্ট্রোকে হঠাৎ মারা যেতে পারেন। তার অন্যান্য পরামর্শ হলো খাবরের লবণ অন্তত অর্ধেক কমিয়ে দিন চর্বিযুক্ত খাদ্য এড়িয়ে চলুন, প্রচুর শাক-সবজি খান, নিয়মিত হালকা ব্যয়াম করুন।উদ্বেগ বা উৎকন্ঠা পরিহার করুন। এগুলো উচ্চ রক্তচাপ সৃষ্টি করে না, কিন্তু তা বাড়িয়ে দিতে পারে।

আর একজন বিশেষজ্ঞ diet সম্পর্কে লিখেছেন যে অনেকের ধারণা আছে যে উচ্চ রক্তচাপ হলে খাদ্য তালিকা থেকে মাংস বাদ দিতে হবে । কিন্তু এই রোগে যারা বিশেষজ্ঞ তারা আরএখন মনে করেন না এটা করা উচিৎ বা দরকার। যারা মোটা তাদের উপকার হবে যদি প্রোটিন এর জন্য অল্প মাংস, মুরগী , মাছ, ডিম এবং ননীবিহীন দুধ খেতে দেওয়া হয়। খাবারের মোটা অংশটা আসবে শাক-সবজী , সালাদ এবং ফলমুল থেকে । চর্বি, শর্করা, চিনি, শস্য কণা ও  ওজন বর্ধক উপাদান থেকে তৈরী সমস্ত খাবার যতটুকু সম্ভব কম খেতে হবে। কোন কোন ক্ষেত্রে ওজন কমার সাথে রক্তচাপ ও কমে আসবে। প্রখ্যাত পুষ্টি বিশরদ Adelle Davis  উচ্চ রক্তচাপের কারণ এবং diet সম্পর্কে কিছুটা ভিন্নমত পোষন করেন। তিনি বলেন সব ক্ষেত্রে উচ্চ রক্তচাপের কারণ জানা না গেলেও কোন কোন ক্ষেত্রে তা জানা যায়। একটি কারণ হল পারিবারিক। যদি পরিবারে এই রোগ থাকে তাহলে ঐ পরিবারের অন্যান্য সদস্যের এ রোগ হতে পারে। তাছাড়া স্ট্রেস বা মানসিক চাপ যে রক্তচাপ সৃষ্টি করতে পারে এর অনেক প্রমাণ আছে। তিনি এক মহিলার কথা উল্লেখ করেছেন। এই মহিলা বিয়ের পর এ  রোগে আক্রান্ত হন। মহিলা বললেন যে, তার স্বামী অতিথি আপ্যায়ন পছন্দ করতেন। কোন কাজের লোক পাওয়া যায় না বলে মহিলাকেই সব কাজ করতে হত। তার জীবন কাটতে রান্না-বান্না এবং ঘর পরিস্কার করে। সংগত কারনে তার মধ্যে একটা চাপা অসন্তোষ ছিল এবং তার রক্তচাপ অস্বাভাবিক বেড়ে গেল। Davis তাকে কয়েকটা Hobby গ্রহণ করতে বললেন । এতে তার টেনশন কমে যেতে পারে। দুই বছর পর তিনি ফিরে এলেন কিছু উপহার নিয়ে এবং নিজের আঁকা একটি ছবি নিয়ে। তার গোসলখানা আগের মত পরিস্কার ছিল না, কিন্তু তার উচ্চ রক্তচাপ স্বাভাবিক হয়ে গেছে। Davis বলেন- পুঞ্জিভুত অনুচ্চরিত নেতিবাচক আবেগ (negative emotions) উচ্চ রক্তচাপের অন্যতম কারণ। একজন প্রতিভাবান মানুষ স্ট্রোকে আক্রান্ত হলে যে দশা হয়, তার থেকে করুন বোধ হয় আর কিছু নেই।

অন্যান্য চিকিৎসকেরা যেখানে খাদ্যের ব্যাপারে সতর্ক থাকার পরামর্শ দিয়েছেন, যেমন লবণ ও চর্বি জাতীয় খাদ্য, সেখানে Davis দুটি উপাদান সমৃদ্ধ খাদ্য গ্রহণের জন্য জোর সুপারিশ করেছেন। এ দুটো উপাদান হলো Choline & Potassium: তিনি একটি গবেষণা প্রতিবেদনের উল্লেখ করেন যেখানে ১৫৮ জন মারাত্মক উচ্চ রক্তচাপে আক্রান্ত রোগীকে Choline খেতে দেওয়া হয়। এদের মধ্যে ১৩৩ জন অজ্ঞাত কারণে আচ্চ রক্তচাপে ভুগছিলেন, ২২ জন মস্তিস্কে এবং চোখে  haemorrahage এ ভুগছিলেন, ৩ জনের ডায়বেটিস ছিল এবং বাকি ১৯ জনের Nephrities নামত কিডনীর অসুখ ছিল। তারা বিভিন্ন ঔষধ খাচ্ছিলেন। তাদেরকে Choline দেয়ার আগে সব ঔষধ বন্ধ করে দেয়া হল। এই ভিটামিন দেয়ার ১০ দিন পর তাদের মাথা ব্যথা , মাথাঘোরা, কান শো শো করা, কোষ্ঠকাঠিন্য- এসব লক্ষণের অনেক উপসম হলো এবং অনেকের একদম সেরে গেল। তিন সপ্তাহের মধ্যে তাদের রক্তচাপ কমে গেল গড়ে ৩১ মিমি. Systolic pressure এবং ২০ মিমি. Diastolic pressure; তাদের তিন ভাগের বেশী রোগীর উচ্চ রক্তচাপ স্বাভাবিক হয়ে গেল। তাদের অনিদ্রা , হাত পা কাঁপা এবং চোখের অস্বস্তি ধীরে ধীরে কমে গেল। তাদের চলাফেরা এবং কথাবার্তা উন্নতি পরিলক্ষিত হলো।তাদের শক্তি-সামর্থ্য বিপুলভাবে বেড়ে গেল। কিন্তু যখন Choline বন্ধ করে দেয়া হল তখন আগের লক্ষণগুলো আবার দেখা ‍দিল।

লবণ ও পটাসিয়াম সম্পর্কে Davis বলেন যে, যেসব দেশের জনগণ লবণ কম খায় সে সব দেশে উচ্চ রক্তচাপ নেই বললেই চলে। উদাহরণ স্বরুপ জাপানে মস্তিকে রক্তক্ষরণে (brain haemorrhage) সবচেয়ে বেশী লোক মারা যায়, আর রক্তচাপ থাকলে মস্তিকে রক্ত ক্ষরণ হয়। উত্তর জাপানে যেখানে লবণাক্ত মাছ (Salt fish) প্রধান খাদ্য, সেখানে লোকে দৈনিক ২৭গ্রাম লবণ খায়। সেখানে এই রোগে মৃত্যুর হার দক্ষিণ অঞ্চলের চেয়ে অনেক বেশী। কারণ দক্ষিণ অঞ্চলের মানুষ দৈনিক ১৭ গ্রাম লবণ খায়। আমেরিকাতে ও উচ্চ রক্তচাপের হার লবণের সাথে সম্পর্কিত । সেখানে মানুষ ১-৫ চামচ লবণ খায়। যারা ষ্ট্রোকে মারা যায় যায় তাদের টিস্যুতে অন্যান্য কারণে মৃত ব্যক্তির (tissue) র চেয়ে লবণের পরিমাণ বেশী পাওয়া যায়। লবণের সাথে পটাসিয়ামের একটা সম্পর্কআছে। লবণ বেশী খেলে প্রস্রাবের সাথে পটাসিয়াম বেরিয়ে যায়। পরীক্ষায় দেখা গেছেযারা বেশী লবণ খায় তাদের প্রস্রাবে যারা কম লবণ খায় তাদের প্রস্রাবের চেয়ে ৯ গুন বেশী পটাসিয়াম বেরিয়ে যায়। সেচ্চসেবক হিসেবে যারা সেখানে দায়িত্ব পালন করছিলেন তাদেরকে সল্প –পটাসিয়াম সমৃদ্ধ খাবার দিয়ে দেখা গেছে যে, তারা উচ্চ রক্তচাপে আক্রান্ত হয়েছেন। সুতরাং Cholinw & Potassium উচ্চ রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণে অত্যন্ত গুরত্বপূর্ণ ভুমিকা পালন করে।

উচ্চ রক্তচাপ : নীরব ঘাতক

দিন দিন উচ্চ রক্তচাপ মানুষের জন্য ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে দাঁড়াচ্ছে । রক্তচাপ নিয়ন্ত্রিত না থাকলে শরীরের গুরুত্বপূর্ণ চারটি অঙ্গে মারাত্মক ধরনের জটিলতা হতে পারে। যেমন- হৃৎপিন্ড কিডনি, মস্তিষ্ক ও চোখ। অনিয়ন্ত্রিত উচ্চ রক্তচাপ থেকে হৃৎযন্ত্রের মাংসপেশি দুর্বল হয়ে যেতে পারে। ফলে হৃৎযন্ত্র রক্ত পাম্প করতে পারেনা এবং এই অবস্থাকে বলা হয় হার্ট ফেইলিওর। রক্তনালি সঙ্কুচিত হয়ে হার্ট অ্যাটাক বা মায়োকার্ডিয়াল ইনফেকশন, কিডনি নষ্ট হয়ে রেনাল ফেইলিউর, মস্তিষ্কে রক্তক্ষরণ বা স্ট্রোক হতে পারে, যা থেকে রোগীর মৃত্যুও হতে পারে। এ ছাড়া চোখের রেটিনা ক্ষতিগ্রস্ত হয়ে অন্ধত্ব বরণ করতে পারে।

কি কি কারণে উচ্চ রক্তচাপ হয়

৯০ ভাগ রোগীর উচ্চ রক্তচাপের কোনো নির্দিষ্ট কারণ জানা যায় না, এক প্রাইমারি বা এসেন্সিয়াল রক্তচাপ বলে। সাধরণত বয়স্ক মানুষের উচ্চ রক্তচাপ বেশি হয়ে থাকে। কিছু কিছু বিষয় উচ্চ রক্তচাপের আশঙ্কা বাড়ায়। যেমন ক. বংশানুক্রমিক উচ্চ রক্তচাপের বংশগত ধারাবাহিকতা আছে, যদি বাবা- মায়ের উচ্চ রক্তচাপ থাকে তবে সন্তানের ও উচ্চ রক্তচাপ হওয়ার আশঙ্কা থাকে । এমনকি নিকটাত্মীয়ের উচ্চ রক্তচাপ থাকলেও অন্যদের রক্তচাপের ঝুঁকি থাকে। খ. ধূমপান: ধূমপায়ীদের শরীরে তামাকের নানা রকম নিষাক্ত পদার্থের প্রতিক্রিয়ায় উচ্চ রক্তচাপসহ ধমনি, শিরার নানা রকম রোগ ও হৃৎরোগ দেখা দিতে পারে। গ. অতিরিক্ত লবণ গ্রহণ : খাবার লবণে সোডিয়াম থাকে, যা রক্তের জলীয় অংশ বাড়িয়ে দেয়। ফলে রক্তের আয়তন বেড়ে যায় এবং রক্তচাপ ও বেড়ে যায়। ঘ. অধিক ওজন এবং অলস জীবনযাত্রা : যথেষ্ট পরিমাণে ব্যায়াম ও শারীরিক পরিশ্রম না করলে, শরীরে ওজন বেড়ে যেতে পারে। এতে হৃদযন্ত্রকে অতিরিক্ত পরিশ্রম করতে হয় এবং এর ফলে অধিক ওজন সম্পন্ন লোকদের উচ্চ রক্তচাপ হয়ে থাকে। ঙ. অস্বাস্থ্যকর খাদ্যাভ্যাস : অতিরিক্ত চর্বিজাতীয় খাবার যেমন মাংস, মাখন এবং ডুবা তেলে ভাজা খাবার খেলে ওজন বাড়বে। কলিজা , গুর্দা মগজ এসব খেলে রক্তে কোলেস্টেরল বেড়ে যায়, যার ফলে রক্তনালির দেয়াল মোটা ও শক্ত হয়ে যায়। ফলে রক্তচাপ বেড়ে যেতে পারে। চ. অতিরিক্ত মদ্যপান : যারা নিয়মিত অত্যধিক পরিমাণে মদ্যপান করে, তাদের উচ্চ রক্তচাপ বেশি হয়। অ্যলকোহলে অতিরিক্ত ক্যালরি থাকে, এর ফলে ওজন বেড়ে যায় এবং রক্তচাপ বেড়ে যায়। ছ. ডায়াবেটিস : ডাযাবেটিস রোগীদের অ্যাথারোসেক্লরোসিস বেশি হয়। ফলে বয়সের সঙ্গে সঙ্গে ডাযাবেটিস রোগীদের উচ্চ রক্তচাপ দেখা দেয়। এ ছাড়া তাদের অন্ধত্ব ও ডিনির নানা রকম রোগ হতে পারে। জ. অতিরিক্ত উৎকষ্ঠা : অতিরিক্ত রাগ, উত্তেজনা ভীতি এবং মানসিক চাপের কারণেও রক্তচাপ সাময়িকভাবে বেড়ে যেতে পারে। যদি এই মানসিক চাপ অব্যাহত থাকে এবং রোগী ক্রমবর্ধমান মানসিক চাপের সঙ্গে খাপ খাওয়াতে না পারেন তবে এই উচ্চ রক্তচাপ স্থায়ী রূপ নিতে পারে। কিছু কিছু রোগও উচ্চ রক্তচাপের কারণ, একে বলা হয় সেকেন্ডারি হাইপারটেনশন। এসব কারনের মধ্যে কয়েকটি হলো কিডনির রোগ , অ্যাড্রেনাল ও পিটুইটারি গ্রন্থির টিউমার , থাইরয়েডের রোগ , ধমনির বংশগত রোগ ,গর্ভধারণ অবস্থায় অ্যাকলাম্পসিয়া ও প্রি-অ্যাকলাম্পসিয়া হলে। অনেক দিন ধরে জন্ম নিয়ন্ত্রণের বড়ির ব্যবহার , স্টেরয়েড জাতীয় হরমোন গ্রহণ এবং ব্যাথা নিরামক কিছু কিছু ঔষধ খেলে। উচ্চ রক্তচাপের ঝুঁকি কমাতে কি করা উচিত? জীবনযাত্রার পরিবর্তন এনে উচ্চ রক্তচাপের ঝুঁকি কমানো সম্ভব। বংশগতভাবে উচ্চ রক্তচাপ থাকলে , তা কমানো সম্ভব নাও হতে পারে। তবে এরকম ক্ষেত্রে যে সব উপাদান নিয়ন্ত্রিণ করা যায়, সেগুলোর ব্যাপারে বেশি মনোযোগী হওয়া উচিত। নিম্নে কিছু প্রয়োজনীয় টিপস দেওয়া হলো।

অতিরিক্তওজন কমাতে হবে : খাওয়া –দাওয়া নিয়ন্ত্রণ করতে হবে ও নিয়মিত ব্যায়াম করতে হবে। একবার লক্ষ্য অনুযায়ী ওজনে পৌঁছলে সীমিত আহার করা উচিত এবং ব্যায়াম অব্যাহত রাখতে হবে। ঔষধ খেয়ে ওজন কমানো বিচজ্জনক। ডাক্তারের পরামর্শ ছাড়া ওজন কমানোর ঔষধ না খাওয়াই ভালো। খাদ্যগ্রহণের ক্ষেত্রে সতর্কতা  : কম চর্বি ও কম কোলেস্টেরল যুক্ত খাবার গ্রহণ করতে হবে। যেমন খাসি বা গরুর গোসত, কলিজা, মগজ গিলা, গুর্দা কম খেতে হবে। কম তেলে রান্না করা খাবার এবং ননী তোলা দুধ, অসম্পৃক্ত চর্বি যেমন সয়াবিন, ক্যানোলা, ভুট্টার তেল অথবা সূর্যমুখীর তেল খাওয়া যাবে। বেশি আশযুক্ত খাবার গ্রহন করা ভালো। আটার রুটি এবং সুজি জাতীয় খাবার পরিমাণ মতো খাওয়া ভালো। তরকারিতে প্রয়োজনীয় লবণের বাইরে অতিরিক্ত লবণ  পরিহার করতে হবে। ধূমপান অবশ্যই বর্জনীয়। ধূমপায়ীর সংস্পর্শ থেকে ‍দূরে থাকুন। তামাক পাতা, জর্দা, গুল লাগানো ইত্যাদিও পরিহার করতে হবে। অতিরিক্ত মদ্যপান পরিহার করতে হবে। সকাল-সন্ধ্যা হাটাচলা, সম্ভব হলে দৌঁড়ানো ,হালকা ব্যায়াম, লিফটে না চড়ে সিঁড়ি ব্যবহার ইত্যাদি। যাদের ডায়াবেটিস আছে, তা অবশ্যই নিয়ন্ত্রণ করতে হবে। নিয়মিত বিশ্রাম সময়মতো ঘুমানো শরীরকে অতিরিক্ত ক্লান্তি থেকে বিশ্রাম দিতে হবে। নিজের শখের কাজ করা নিজ ধর্মের চর্চা করা ইত্যাদির মাধ্যমে মানসিক শান্তি পাওয়া যায়। নিজ ধর্মচর্চার মাধ্যমে রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণে সহায়ক ভুমিকা রাখেতে পারে। নিয়মিত চিকিৎসকের কাছে গিয়ে রক্তচাপ পরীক্ষা করানো উচিত। যত আগে উচ্চ রক্তচাপ শনাক্ত করা যায় এবং নিয়ন্ত্রণ করা যায়, ততই জটিল রোগ বা প্রতিক্রিয়া হতে রক্ষা পাওয়া যায়। যেসব ঔষধ ব্যবহারে উচ্চ রক্তচাপের ঝুঁকি থাকে, ডাক্তারের পরামর্শ ছাড়া তা কোনোক্রমেইব্যবহার করা যাবে না। উচ্চ রক্তচাপ নিরাময়যোগ্য নয়, একে নিয়ন্ত্রণ করা যায়। এজন্য নিয়মিত ঔষধপত্র সেবন করতে হবে। অনেক রোগী কিছুদিন ঔষধ সেবনের পর রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণে এলে ঔষধ বন্ধ করে দেন, মনে করেন রক্তচাপ ভালো হয়ে গেছে, কাজেই ঔষধ খাওয়ার দরকার কি? এই ধারণা সম্পূর্ণ ভুল। কোনোক্রমেই ডাক্তারের নির্দেশ ছাড়া ঔষধ সেবন বন্ধ করা যাবে না। অনেকেই আবার উচ্চ রক্তচাপে আক্রান্ত জানার পরেও ঔষধ খেতে অনীহা প্রকাশ করেন বা খেতে চান না। কারও কারও ধারণা একবার  ঔষধ খেলে তা আর বন্ধ করা যাবে না। আবার কেউ কেউ এমনও ভাবেন, উচ্চ রক্তচাপ তার দৈনন্দিন জীবনপ্রবাহে কোনো সমস্যা করছে না বা রোগের কোনো লক্ষণ নেই, তাই উচ্চ রক্তচাপের ঔষধ খেতে চান না। মনে করেন ভালোই তো আছি, ঔষধের কি দরকার? এই ধারণাটাও সম্পূর্ণ ভুল। এ ধরনের রোগীরাই হঠাৎ করে হৃদরোগ বা স্ট্রোকে আক্রান্ত হন, এমন কি মৃত্যুও হয়ে থাকে। তাদের অবশ্যই ডাক্তারদের পরামর্শ নিতে হবে, নিয়মিত ঔষধ সেবন করতে হবে এবং নিয়মিত চেক করতে হবে।

তথ্যসূত্র : অধ্যাপক ডা. এ বি এম আবদুল্লাহ :অধ্যাপক ও ডিন, মেডিসিন অনুষদ বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়।