ক্যান্সারের আশঙ্কাজনক বিস্তার

সমকালিন কয়েকটি মরণঘাতি রোগ

ক্যান্সারের আশঙ্কাজনক বিস্তার ঘটেছে সারা দেশে। ক্রমশ বেড়েই চলেছে এই মরণব্যাধির প্রকোপ। বিভিন্ন এলাকা থেকে রাজধানীর হাসপাতালগুলোয় ভিড় করে আসছে ক্যান্সার আক্রান্ত রোগীরা। রোগীর চাপ এত বেশি যে হাসপাতালগুলোয় স্থান সংকুলান হচ্ছে না। তীব্র সিট সংকেটের কারণে দিনের পর দিন দুর্ভোগ পোহাচ্ছে রোগীরা। সিট সমস্যা ছাড়ও ব্যয়বহুল ঔষধ কিনে সর্বশান্ত দরিদ্র রোগীরা। রেডিওথেরাপি মেশিনের অভাবে বিনা চিকিৎসায় ধুকে ধুকে মরছেন অনেকেই। স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রনালয় এবং বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার জরিপ অনুযায়ী বাংলাদেশে ১৫ লাখ ক্যান্সার (২০১৭) রোগীর মধ্যে প্রতিবছর দেড় লাখ মানুষের প্রাণ কেড়ে নিচ্ছে প্রাণঘাতী ক্যান্সার। এ ছাড়া নতুনভাবে বছরে আক্রান্ত হচ্ছে দুই লাখ মানুষ। হৃদরোগের পরই দ্বিতীয় ঘাতক রোগ হচ্ছে এই ক্যান্সার। নারীরা সবচেয়ে বেশি আক্রান্ত হচ্ছে স্তন ক্যান্সারে। সম্প্রতি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয় হাসপাতালের সার্জারি বহির্বিভাগের ৯ নম্বর কক্ষে ১৫ মিনিটে ৩ জন স্তন ক্যান্সারের রোগিনীকে প্রবেশ করতে দেখা যায়। এই হাসপাতালে আসা ক্যান্সার রোগীদের মধ্যে ৩৫ শতাংশ ফুসফুস, ১৫ শতাংশ পাকস্থলী, ১২ শতাংশ লিভার ও ১০ শতাংশ স্তন, ৩০ শতাংশ জরায়ু ও ১২ শতাংশ অন্তের ক্যান্সারে আক্রান্ত। সারা দেশে স্তন ক্যান্সারে ভুগছে মোট ক্যান্সার রোগীর ১৮ শতাংশ।

গত তিন বছরে ক্যান্সার রোগীর হার আশঙ্কাজনক হারে বৃদ্ধি পেয়েছে। জাতীয় ক্যান্সার ইনস্টিটিউট হাসপাতালে ২০১১ সালে ৭ হাজার, ২০১২ সালে ১১ হাজার এবং ২০১৩ সালে ১৪ হাজার ক্যান্সার রোগী চিকিৎসা নিয়েছে। বাংলাদেশে মোট ক্যান্সারের রোগীর মধ্যে ২৫ শতাংশ হেড নেক, ২২ শতাংশ ফুসফুস, ১৮ শতাংশ স্তন, ১৬ শতাংশ জরায়ুমুখের ক্যান্সারে ভুগছে। ফুসফুসের ক্যান্সার রোগীদের ৮৫ শতাংশেই ধুমপায়ী।

ক্যান্সার রোগী বাড়ার পাশাপাশি দেখা দিচ্ছে চিকিৎসা ব্যবস্থার অপ্রতুলতাও। এর মধ্যে বড় সমস্যা হাসপাতালে সিট পাওয়া। জাতীয় ক্যান্সার ইনস্টিটিউট হাসপাতালে প্রায়ই ক্যান্সার রোগীকে সিটের জন্য ঘুরতে দেখা যায়। তাদেরই একজন আফসার হোসেন। আক্রান্ত ১৫ বছরের এই কিশোর হাসপাতালের পরিচালকের কাছে এসেছিল একটি সিটের আশায়। সিট খালি না থাকায় ভর্তি হতে পারেনি। আফসার জানায়, ক্যান্সারের চিকিৎসা করাতে গিয়ে তার রাজমিস্ত্রি বাবা সর্বস্বান্ত। তারপরও ডান পা রক্ষা করা সম্ভব হয়নি। তার প্রতি বাবা-মা খুবই বিরক্ত। রাগ করে হাসপাতালেও আসেননি। ক্রাচে ভর করে তাই গ্রামের বাড়ি চাঁদপুর থেকে ঢাকায় এসেছে একাই। সিট জোগাড় হলে হয়তো অভিমানী মা-বাবা কর্জ করে টাকা নিয়ে আসতেও পারেন।

জাতীয় ক্যান্সার ইনস্টিটিউট হাসপাতালের পরিচালক অধ্যাপক ডা. মোশারফ হোসেনের মতে, ২২টি বিভাগের জন্য হাসপাতালের মোট সিট ১৫০টি। রোগীর চাপ এত বেশি যে কাকে দেব আর কাকে না দেব। তবে রোগীর সংখ্যা বাড়লেও ক্যান্সার চিকিৎসায় বাংলাদেশ অনেকটা পথ এগিয়েছে। চিকিৎসকদের অভিজ্ঞতা, জ্ঞান ও দক্ষতা বৃদ্ধি পেয়েছে। চিকিৎসা সেবার মান ও পরিধি বেড়েছে। হাসপাতালে সকাল ৮টা থেকে রাত ১০টা পরযন্ত ৫০০ ক্যান্সার রোগীকে থেরাপি দেওয়া হচ্ছে। কিন্তু গরিব রোগী বিনামূল্যে পাচ্ছে কেমোথেরাপির ঔষধও। ক্যান্সারের ঔষধের মূল্য কমেছে। কয়েক বছর আগে একটি টারসাবা প্যাবলেটের দাম ছিল ৮ হাজার টাকা। এখন এটি ৩ হাজারের নিচে। ক্যান্সারের ঔষধের মূল্য আরও কমানোর জন্য প্রাইভেট কোম্পনির মালিকদের প্রতি অনুরোধ করেছেন তিনি। তার মতে, যেসব কারণে ক্যান্সার হয় সেগুলো দূর করলেই আক্রান্তের হার কমে যাবে। এজন্য ধুমপান ও তামাকজাত দ্রব্য সেবন বন্ধ করতে হবে এবং পরিবেশ দূষণ রোধ করতে হবে। পাশাপাশি রোগীর চাপ কমাতে ঢাকার বাইরে প্রতি চারটি জেলার জন্য একটি ক্যান্সার চিকিৎসা কেন্দ্র প্রতিষ্ঠা, ক্যান্সার হাসপাতালে সিট বৃদ্ধি এবং রেডিওথেরাপি মেশিনের সংখ্যা বাড়ানো প্রয়োজন।

একই হাসপাতালের সাবেক পরিচালক অধ্যাপক ডা. এসকে গোলাম মোস্তফা এবং বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয় হাসপাতালের ক্যান্সার বিভাগের চেয়ারম্যান ডা. সরোয়ার আলম বলেন, মানুষের মধ্যে  ক্যান্সার সম্পর্কে সচেতনতা বাড়াতে হবে। আগের থেকে এই সচেতনতা বাড়ছে বলে মনে করেন তারা। আর এজন্যই ক্যান্সার রোগ তাড়াতাড়ি ধরাও পরেছে। সামান্য একটি সুই দিয়ে এফএনএসি পরীক্ষা করেই জানা যায় ক্যান্সার। তারা বলেন, ক্যান্সারের চিকিৎসা তিন ধরনের। রেডিওথেরাপি, কেমোথেরাপি ও সার্জারি। ৬০ শতাংশ ক্যান্সার রোগীর কোনো বা কোনো সময় প্রয়োজন হয় রেডিওথেরাপি। অথচ সরকারিভাবে ক্যান্সার হাসপাতাল, ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালসহ পুরোনো কয়েকটি মেডিকেল কলেজেই  কেবল রেডিওথেরাপি মেশিনের ব্যবস্থা রয়েছে। সূচনায় ধরা পড়ণে ক্যান্সারের রোগী ভালো হয়ে যায়। দেরিতে এলে চিকিৎসা পেলেও পুরোপুরি সুস্থ হয় না। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের হাসপাতাল ও ক্লিনিক শাখার ভারপ্রাপ্ত পরিচালক অধ্যাপক ডা. এবিএম আব্দুল হান্নান জানান, ক্যান্সার হাসপাতালের সিট বিৃদ্ধিসহ অন্যান্য সরকারি হাসপাতালের উন্নতমানের রেডিওথেরাপি মেশিন বৃদ্ধির জন্য স্বাস্থ্যমন্ত্রী জোর  দিয়েছেন। ইতোমধ্যে ৭টি সরকারি হাসপাতালে উন্নতমানের রেডিওথেরাপি মেশিন কিনে চিকিৎসা দেয়া হচ্ছে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার হিসাবে, বাংলাদেশে ১৬০টি ক্যান্সার চিকিৎসা কেন্দ্র প্রয়োজন। সেই তুলনায় সরকারিভাবে মাত্র ৯টি এবং প্রাইভেট হাসপতালে ৭টি ক্যান্সার চিকিৎসা কেন্দ্র আছে। ক্যান্সার বিশেষজ্ঞ আছেন মাত্র ১২০ জনের মতো।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *