হৃদরোগের লক্ষণ নির্ণয়

সমকালিন কয়েকটি মরণঘাতি রোগ

যুক্তরাষ্ট্রের শতকরা ৫০ ভাগ মৃত্যু ঘটে হৃদরোগের কারনে। অন্যান্য দেশের তুলনায় এই হার ১০ গুন বেশী। এই রোগে মহিলার তুলনায় পুরুষেরা বেশী মারা যায় এবং তাদের অধিকাংশের বয়স ৪৫ এর নীচে। হৃদরোগ নানান ধরণের আছে। যেমন- Congenial Heart disease, Rheumatic Heart diseases, Hardening of the arteries, Coronary thrombosis, Angina Rectories ইত্যাদি। শেীর ভাগক্ষেত্রে হৃদপিন্ডের মাংশ পেশিতে রক্ত সরবরাহকারী ধমনী শক্ত হয়ে যায় অথবা সরু হয়ে যায়। তখন ঠিকমত রক্ত সরবরাহ করতে পরেনা এবং ধমনী জমে এক বারে রক্ত বন্ধ হয়ে যায় তখনই আক্রমন (At tact) হয়।

কেন এমনটি হয়? এ সম্বন্ধে বিশেষজ্ঞগন মনে করেন ২টি কারণ থাকতে পারে। রক্তে অতিরিক্ত চর্বি এবং রক্তে অতিরিক্ত কোলেস্টরল। উদাহরণ স্বরুপ, হৃদরোগে আক্রান্ত ১০০ জন রোগীর রক্ত পরীক্ষ করে দেখা গেছে মাত্র ১৮ ভাগ রোগী কোলেস্টেরল ছিল ২৫০ মিলিগ্রামের উপরে। পক্ষান্তরে বাকী রোগীদের ছিল অতিরিক্ত চর্বি। রক্তের এই চর্বি বেড়ে যায় যদি খাদ্যের মধ্যে চর্বি থাকে। এটা খাওয়ার ২ ঘ: মধ্যে ঘটে। যদি কোন খাদ্য না খাওয়া হয় তাহলে দেহে জমাকৃত চর্বি রক্তে চলে আসে এবং স্বাভাবিক থেকে ছয়গুন বেড়ে যেতে পারে। তােই কোন মিল না খাওয়া হৃদরোগীর জন্য বিপদজনক হতে পারে। রক্তের চর্বি কমানো যায় নিয়মিত হালকা ব্যায়াম করে। যারা সুস্থ তাদের রক্তের চর্বি খাবারের পর বেড়ে যায়। কিন্তু ৩-৪ ঘন্টা পর তা আবার স্বাভাবিক পর্যায়ে নেমে আসে। কিন্তু যাদের হৃদরোগ আছে তাদের ক্ষেত্রে এই চর্বি বৃদ্ধি ৬ ঘন্টা বা আরো বেশী থাকতে পারে। দেখা গেছে কোন ভারী ভোজের অনুষ্ঠান, বিয়ে-শাদী , হোটেলে ডিনার, Christmas diner এ যখন প্রচুর  Saturated fat (Animal Fat) খাওয়া হয় তখন বছরের অন্য সময় থেকে বেশী বেশী হৃদরোগ আক্রমণের ঘটনা ঘটে। যে সব হৃদরোগী মানসিক পাটে থাকে তাদের রক্তেও চর্বির পরিমাণ বিপদজনক পর্যায়ে বৃদ্ধি পেতে পারে । দায়িত্বশীল ব্যক্তি বা  Execuative দের রক্তে চর্বির পরিমাণ শান্তশিষ্টদের চেয়ে বেশী এবং তাদের মধ্যে  হৃদরোগ আক্রমণের সম্ভাবনা ৭ গুন বেশী।

হৃদরোগের লক্ষণ কি? সেগুলো আলোচনা করার আগে কতগুলো নির্দোষ লক্ষণকে হৃদরোগের আগাম লক্ষণ বলে ভুল করে থাকি। সেগুলো উল্লেখ করা দরকার

১. বুক ধড়পড় (Palpitation): এটা হল দ্রুত হৃদস্পন্দন। এর কারণ হতে পারে রোগী হয়তবা ব্যায়াম করেছেন অথবা তার ভয়ে কাঁপানো অথবা একটুতে উত্তেজনাপূর্ণ অভিজ্ঞতা রয়েছে । প্রায় রাত্রে ঘুম ভেঙ্গে যেতে পারে একটি দুঃস্বপ্নের কারণে। তার মনে হতে পারে হৃদপিন্ড খারাপ অবস্থার মধ্যে আছে এবং তিনি মারা যেতে পারেন। ডাক্তার না আসা পর্যন্ত তিনি মৃত্যু ভয়ে বিচলিত হতে পারেন। এক্ষেত্রে ডাক্তার ভাল করবেন যদি তিনি নিশ্চিত হতে পারেন যে তার রোগী একজন নার্ভাস লোক এবং তার এ অবস্থার আগে তিনি অপ্রীতিকর অভিজ্ঞতার সম্মুখীন হয়েছিলেন, যেমন কারো সাথে উত্তেজিত হয়ে তর্ক-বিতর্ক করা কোন খারাপ খবর পাওয়া ইত্যাদি। এই ধরণের ব্যক্তি একটু ব্যায়াম করলে বা উত্তেজিত হলে দ্রুত হৃদস্পন্দন বেড়ে যেতে পারে। তাদের সমস্যা হৃদরোগের কারণে নয় নার্ভের কারণে। তাদের এ ধরনের নার্ভের সমস্যা উত্তরাধিকার সুত্রে পেয়েছেন এবং তারা দুঃশ্চিন্তা করতে অভ্যস্ত।

২.      Pre-mature beats: এটা অনেকের জন্য অনাবশ্যক দুঃশ্চিন্তর কারণ হয়ে থাকে। মনে হয় হৃদপিন্ড একটি বিট মিস্ করছে। অনেক লোকের বেশীর ভাগ সময় এ ধরনের ব্যাপার ঘটে।কিন্তু তারা অতিরিক্ত স্পর্শকাতর নয় বলে এটা টের পায়না। এটা আক্রান্ত হৃদপিন্ড বা স্বাভাবিক হৃদপিন্ডের ক্ষেত্রেও হতে পারে। এটা হলে একজন ভাল ডাক্তার দেখাতে হবে। যদি হৃদপিন্ড স্বাভাবিক হয়, তাহলে এটা নিয়ে উদ্বিগ্ন হওয়ার কারণ নেই। কারণ এ ধরনের missing beats তার সারা জীবনে ঘটতে পারে এবং তার কোন ক্ষতি হবে না। এমনকি যদি হৃদপিন্ড অসুস্থ হয় তাহলেও উদ্বেগের কোন কারন নেই। এটা বিপদের লক্ষণ নয়। এ ধরনের অতিরিক্ত বিট ঘটে সাধারণতঃ দিনের শেষে অথবা তিনি যখন অতিরিক্ত ক্লান্ত থাকেন এবং  হৃদপিন্ডের নার্ভগুলি অস্বাভাবিক থাকে ।

৩.      Air Hunger: অনেক মহিলা ও পুরুষ আছেন যারা ভয় পেয়ে যান যখন তারা শ্বাস কষ্ট বোধ করেন এবং এটাকে হৃদরোগের লক্ষণ বলে মনে করেন। এটা আসলে আসল শ্বাস কষ্ট নয়। এটা একটা অনুভুতি যে বাতাস Lung এর গভীরে পোঁছাচ্ছে না এবং রোগী কখনো কখনো জানালার ধারে যান ফ্রেশ অক্সিজেন পাওয়ার জন্য। কিন্তু এতে কোন লাভ হয় না কারণ ভিতরে বাহিরে অক্সিজেন একই রকম। ডাক্তার বুঝতে পারেন এটা কোন হৃদরোগ জনিত শ্বাস কষ্ট নয়। কারণ এ ধরনের রোগী তিনি অনেক দেখেছেন। যদি হৃদপিন্ডের দুর্বলতা হয়, তাহলে সেটা আসবে ব্যাযামের পর। রোগী যখন বাঢ়িতে বিশ্রামে থাকেন তখন শ্বাস কষ্ট হওয়ার কথা নয়। আসল কথা হল এধরনের শ্বাসকষ্টে উদ্বিগ্নহওয়ার কোন কারন নেই যখন ডাক্তার পরীক্ষা করে দেখলেন যে, রোগীর হৃদপিন্ড স্বাভাবিক রয়েছে।

এবার হৃদরোগের আসল লক্ষন গুলো উল্লেখ করা যাক। প্রথম লক্ষণ হলো সিঁড়ি দিয়ে উপরে উঠতে গেলে বা দ্রুত হাটলে হাঁপিয়ে উঠা। এ লক্ষণ আগে ছিল না কিন্তু ইদানিং দেখা দিয়েছে। অবশ্য যারা মোটা হয়ে গিয়েছেন অথবা মধ্যম বয়স পার হয়ে গেছেন অথবা ব্যায়াম করতে অভ্যস্ত নন, তারা স্বাভাবিকভাবে হাঁপিয়ে উঠতে পারেন। কিন্তুতারা লক্ষ্য করবেন যে এখন তারা যত সহজে হাঁপিয়ে উঠছেন আগেএমনটি ছিল না। যদি তারা চিকিৎসা না করান তাহলে দেখবেন যে, কোন ব্যায়াম ছাড়া তারা হাঁপিয়ে উঠছেন। এমনকি তারা কাপড় পড়তে বা জুতার ফিতা বাঁধতে হাঁপিয়ে উঠছেন। সুতরাং এসব ব্যাপারে দেরী না করে তাড়াতাড়ি ডাক্তার দেখানো উচিত। প্রথম থেকেই চলাফেরা, খাওয়া-দাওয়ায় সাবধানতাঅবলম্বন এবং হালকা ব্যায়াম করলে অবশ্যই হৃদরোগ থেকে বেঁচে থাকা সম্ভব।

আর আক্রান্ত ব্যক্তিকে হাসপাতালে নেয়ার সময় তার প্রতি বিশেষ নজর রাখবেন। Nitroglycerine tablet হাতের কাছে থাকলে একটি ট্যাবলেট জিবের নীচে রাখুন। এত আপনার ব্যাথা/স্ট্রেস বা মানসিক চাপ কমে যেতে পারে। আর রোগী যদি অজ্ঞান হয়ে যান এবং বুকে কান লাগিয়ে তার হৃদস্পন্দন শোনা না যায় তাহলে গাড়ী থামিয়ে রোগী বাহিরে নিয়ে এসে শক্ত কিছুর উপর রেখে তাকে CRP (Cardiopulmonary resuscitation) প্রয়োগ করুন তার রক্ত প্রবাহ ও নিঃশ্বাস ফিরিয়ে আনার জন্য। ৪ মিনিটের মধ্যে এই CRP  প্রয়োগ করতে ব্যর্থ হলে মস্তিষ্ক স্থায়ীভাবে ক্ষতিগ্রস্থ হতে পারে বা রোগীর মৃত্যু ঘটতে পারে। হৃদরোগ যাতে না হয় বা হলে কি করনীয় আছে : যে সব খাদ্যে Unsaturated Fat আছে যেমন মাছ, চিকেন, এবং অন্যান্য প্রোটিন সমৃদ্ধ কিন্তু Low Fat সেগুলি খেলে হৃদরোগের ঝুঁকি কমে যায় এ ব্যাপারে সব ডাক্তার একমত। তারা এই মতামত দিয়েছেন অনেক পরীক্ষ নিরীক্ষার ভিত্তিতে। কিন্তু যে বিষয়ের উপর জোর ‍দিয়েছেন সেটি হল fat বা চর্বি। কিন্তু Nuclic acid এর আবিস্কারক Dr. Benjamin Frank পরীক্ষা করে দেখিয়েছেন যে , এই  Nuclic acid আমাদের স্বাস্থ্যে অভূতপুর্ব পরিবর্তন আনতে পারে

তিনি ১৬ জন রোগীর উপর এই খাদ্যের একটি পরীক্ষা চালান। এর মধ্যে একজনের বয়স ছিল ৪৯ বছর। তিনি সামান্য হাঁটলেই বুকে ব্যাথা অনুভব করতেন। Nuclic acid সমৃদ্ধ খাবার দিয়ে পরীক্ষা করানোর আগে তিনি ডাক্তারের পরামর্শ মত Low Fat diet খেতেন। কিন্তু তার অবস্থা ক্রমাগত খারাপের দিকে যাচ্ছিল । Nuclic acid সমৃদ্ধ খাবার গ্রহণ করার ৪ সপ্তাহ পর তার অবস্থার উন্নতি হতে লাগল। এখন তিনি এক মাইল দুই মাইল ব্যাথা অনুভব না করেই হাঁটতে পারেন। কঠিন কোন পরিশ্রম করলে ব্যাথা হয় , কিন্তু সেটা সামান্য। তিনি আরো লিখেছেন রাগ , ভয়, হতাশা ও অন্যান্য নেতিবাচক আবেগ রক্তে চর্বি ও কোলেস্টারেল এর পরিমান বাড়িয়ে দেয়।

তিনি ভিটামিন ই এর উপর জোর দিয়েছেন। এই ভিটামিন-ই  হৃদপিন্ডের রক্তনালীকে শক্ত করে এবং রক্তের জমাট বাধা দূর করে। ১০০ জন রোগীকে দৈনিক ২০০ মি. গ্রাম ভিটামিন-ই দিয়ে এবং যাদের কে এই ভিটামিন দেয়া হয়নি তাদের সাথে তুলনা করে দেখা গেল যে শেষাক্তরা প্রথম জনদের চেয়ে ৪ গুন বেশী হৃদরোগে আক্রান্ত হয়েছেন। অনুরুপভাবে ৪৫৭ জন রোগীকে এই ভিটামিন দিয়ে দেখা গেল যে তাদের রক্তে কোন জমাট বাঁধেনি। তাই ভিটামিন-ই হৃদরোগীদের জন্য অত্যন্ত মুল্যবান। ৭ বছর ব্যাপী ২০০০ রোগীর উপর পরীক্ষা চালিয়ে দেখা গেছে যে যারা দৈনিক ৫কাপ বা তার অধিক কফি খেয়েছেন তাদের করোনারী রোগের লক্ষণ প্রকাশ পেয়েছে। আমেরিকার হার্ট এসোসিয়েশন (The American Heart Association) বলে: কোন ব্যক্তি যদি Overweight হন , তার পরিবারে কেউ যদি হৃদরোগের ইতিহাস থাকে রক্তে কোলেস্টারেল এর মাত্রা বেশী থাকে , উচ্চ রক্তচাপ থাকে এবং যদি তিনি  বেশির ভাগ সময় বসে কাটান এবং হতাশায় ভোগেন তাহলে তার জীবন যাপন পদ্ধতি পরিবর্তন করা উচিৎ।

আর একজন বিশেষজ্ঞ লিখেছেন হৃদরোগীকে তার হৃদপিন্ডের সীমাবদ্ধাতার কথা জানতে হবে। যদি তিনি সাবধানে চলেন তাহলে তিনি উপকৃত হবেন। তাকে তার জীবন যাত্রা এবং কর্মপদ্ধতি পরিবর্তন করতে হবে। যদি তিনি দোতালায় থাকেন তাহলে তাকে একতলায় নামতে হবে। তাকে দায়িত্বপুর্ণ চাকরী থেকে অবসর নিতে হতে পারে এবং তার ওযাকিং ঘন্টা কমিয়ে দিতে হতে পারে। মানসিক চাপ সৃষ্টি হয় এমন কিছু এড়িয়ে চলতে হবে। তাকে শান্ত শিষ্ট থাকতে হবে িএবং ডাক্তারের পরামর্শ অনুযায়ী  জীবন যাপন করতে হবে। মাত্র ১ কাপ কফিতে রক্তের চর্বি এবং কোলেস্টোরেল দ্রুত বেড়ে যেতে পারে। কিন্তু খাদ্যে যদি Vitamin-C এবং  Panthonic acid থাকে তাহলে এ প্রতিক্রিয়া তেমন কোন ক্ষতি করতে পারে না । নিম্নে Vitamin-C এবং Panthonic acid সমৃদ্ধ একটি খাবারের তালিকা প্রদান করা হল ।

Vitamin – E সমৃদ্ধ খাবার তালিকা

খাদ্য তালিকাপরিবেশন/পরিমাণপ্রতি পরিবেশনে Vitamin – E এর পরিমাণ (মি. গ্রাম)
কর্ণ ওয়েল১ টেবিল চামচ৩৫.০
সয়াবিন তৈল৪ আউন্স১৩-১৭
মাছ৪ আউন্স৯.০
হুইট জার্ম১/৪ কাপ৪-৬
গাজর১ কাপ (কুচি করা)২.১
ডিম১টা১.৫
ওটমিল১কাপ০.৫

Panthonic Acid সমৃদ্ধ খাবার

খাদ্য তালিকাপরিবেশন/পরিমাণপ্রতি পরিবেশনে এর Panthonic Acidপরিমাণ (মি. গ্রাম)
গরুর কলিজা৪ আউন্স৫৮
ব্রকোলি১ কাপ২১
চিকেন৮ আউন্স১২-২০
মাশরুম১০টা১৭
গরুর হৃদপিন্ড৩ আউন্স১৫
ডিম১টা১৩
মিষ্টি আলু১.৫*২ কাপ১১
সয়াবিন১/৪ কাপ
ফুলকপি১ কাপ
বাদাম১/৪ কাপ

তথ্য সুত্র:     1. Benjamin Frank, No-aging Diet

                   2. Help your Doctor help your self

                   3. Reader’s digest, December 1973