হৃদরোগ (Heart Disease)

সমকালিন কয়েকটি মরণঘাতি রোগ

বাংলাদেশে মহামারী রুপ নিচ্ছে হৃদরোগ। রোগসৃষ্ট কারনে মৃত্যুর প্রধান কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে হৃদরোগ। কয়েক বছর আগেও ডায়রিয়া ও নিউমোনিয়া সহ বিভিন্ন সংক্রামক রোগে দেশে মৃত্যুর হার বেশি থাকলেও এখন হৃদরোগে শিশু ও বয়স্ক-সব বয়সী মানুষই আক্রান্ত হচ্ছে। চিকিৎসকরা বলেছেন, অতীতের যে কোনো সময়ের চেয়ে এখন হৃদরোগে আক্রান্ত রোগীর সংখ্যা বেশি। তবে হৃদরোগীর প্রকৃত সংখ্যা কত, তা নিয়ে নির্দিষ্ট পরিসংখ্যানে না থাকলেও বিশেষজ্ঞদের মতে, এ সংখ্যা মোট জনসংখ্যার প্রায় ২০ শতাংশ। বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকরা জানিয়েছেন, যে ভাবে হৃদরোগে মানুষ আক্রান্ত হচ্ছে এবং এ কারনে মৃত্যু হচ্ছে তাতে বলা যেতে পারে এটি শীঘ্রই মহামারীতে রূপ নিতে যাচ্ছে।স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের হেলথ বুলেটিন থেকে জানা যায়, হাসপাতালে এখন হৃদরোগের কারণেই সর্বাধিক রোগীর মৃত্যু ঘটেছে। অন্যদিকে খাদ্যাভাস ও জীবনযাত্রার জন্য বাংলাদেশের  ক্রমান্বয়ে হৃদরোগের আক্রান্ত শিশুর সংখ্যা বৃদ্ধি পাচ্ছে। বেসরকারি জরিপে হৃদরোগে আক্রান্ত শিশুর সংখ্যা তিন লাখেরও বেশি। বেসরকারি জরিপ মতে প্রতি ২৫ থেকে ৩০ হাজার শিশু হৃদরোগ নিয়ে জন্মগ্রহণ করে।অথচ রোগ বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের যথেষ্ট অভাব। স্বাস্থ্যবিষয়ক আন্তর্জাতিক জার্নাল ল্যানচেটে ২০১৩ সালে ১ লাখ ৭৮ হাজার মানুষের মৃত্যু হয় স্ট্রোকে এবং ১ লাখ ৬ হাজার মানুষ হার্ট অ্যাটাকে ও ২৮ হাজার মানুষ উচ্চ রক্তচাপ জনিত হৃদরোগে মারা যান। বিশেষজ্ঞরা অতিমাত্রায় তেল ও চর্বিযুক্ত খাদ্য গ্রহণকে হৃদরোগে আক্রান্ত হওয়ার জন্য দায়ী মনে করেন। এদিকে কয়েক বছরে ডায়রিয়া রোগে মৃত্যুর হার কমলেও হৃদরোগে মানুষের মৃত্যুহার বেড়েছে। ওয়াশিংটন বিশ্ববিদ্যালয়ের এক জরিপ থেকে জানা যায়, ১৯৯০ – ২০১৩ সাল পর্যন্ত বিভিন্ন রোগের মধ্যে সবচেয়ে বেশী হৃদরোগে আক্রান্ত হয়ে মানুষের মৃত্যু হয়। এ ছাড়া ১৫-৪৯ বছর বয়সী মানুষের মৃত্যুর প্রধান দুটি কারণের একটি হৃদরোগ। এদিকে ন্যাশনাল হার্ট ফাউন্ডেশনের তথ্যে জানা যায়, প্রতি হাজারে একজন করে নবজাতক জন্মগতভাবে হৃদরোগে আক্রান্ত হচ্ছে। এর মধ্যে শুধু বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ে শিশু কার্ডিওলজি ইউনিট আছে। এ ইউনিটে প্রতিদিন গড়ে ১০-১২ জন শিশু চিকিৎসা নিচ্ছে। ল্যাবএইড হাসপাতালের হৃদরোগ বিশেষজ্ঞ ডা. মাহবুবুর রহমান বাংলাদেশ প্রতিদিন কে বলেন, সাধরনত হৃদরোগে জিনগত এবং মানবদেহের রক্তনালিতে চর্বি জমে যাওয়ার কারণে এটা হয়।

এ ছাড়া ডায়বেটিস রোগের সঙ্গে এর ঘনিষ্ঠ সম্পৃক্ততা রয়েছে। এই বিশেষজ্ঞ মনে করেন, জীবনযাত্রা পরিবর্তন, কায়িক পরিশ্রমে কমে যাওয়া ও পরিবেশ দূষণ হৃদরোগের জন্য দায়ী। বর্তমানে হৃদরোগে আক্রান্তের সংখ্যা দিন দিন বৃদ্ধি পাচ্ছে। এভাবে চলতে থাকলে খুব শীঘ্রই এটি মহামারীতে রূপ নেবে। এ ভয়াবহতা প্রতিরোধে আমাদের স্বাস্থ্যব্যবস্থায় পর‌্যাপ্ত সুযোগ-সুবিধা নেই। চিকিৎসকদের মতে, ধুমপান উচ্চমাত্রার ক্যালরি , উচ্চমাত্রার রক্তচাপ, ফাস্টফুড, ফরমালিন ও ভেজালযুক্ত খাবর গ্রহণ, শরীর চর্চার অভ্যাস না করা এবং দুশ্চিন্তাসহ নানাবিধ কারণে হৃদরোগের সংখ্যা বেড়ে যাচ্ছে। আশঙ্কার বিষয়, হৃদরোগীর সংখ্যা বাড়লেও এ রোগের চিকিৎসা সেবার মান নির্ণয়ে রোগী ও স্বজনরা সন্তুষ্ট নন। তাদের মতে, ঢাকয় যে সব সরকারি হাসপাতাল রয়েছে তাতে সেবার মান ভালো নয়। অন্যদিকে বেসরকারি হাসপাতালগুলো ও মাত্রাতিরিক্ত ফি দিয়ে সবার পক্ষে চিকিৎসা গ্রহন সম্ভব নয়। কার্ডিয়াক সোসাইটির মতে দেশে হৃদরোগে বিশেষজ্ঞ থাকলেও জনবলের সুষ্ঠ ব্যবস্থাপনায় ত্রুটি রয়েছে। এছাড়া পরীক্ষা-নিরীক্ষার জন্য বিশেষায়িত যন্ত্রপাতি স্থাপন ও নোকাটায় বড় ধরনের দুর্নীতির জন্য হৃদরোগ চিকিৎসায় সমস্যা হচ্ছে। সরেজমিনে দেখা যায় জাতীয় হৃদরোগ ইনস্টিটিউট ও হাসপাতালে রোগীর ধারনক্ষমতার চেয়ে ভর্তি রোগীর সংখ্যা বেশী। একই অবস্থা ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে। অন্যদিকে রাজধানীর বেসরকারি হাসপাতালগুলোয় হৃদরোগের চিকিৎসা সেবায় যে খরচ হয় তা সবার পক্ষে বহন করা সম্ভব নয়।সরকারি হাসপাতালে এনজিওগ্রাম করতে খরচ হয় ২ হাজার টাকা। অথচ বেসরকারি হাসপাতালে ১৩ হাজার টাকা। উত্তরা আধুনিক মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের হৃদরোগে বিভাগের প্রধান অধ্যাপক ডা. রফিকুল ইসলাম লিটু বাংলাদেশ প্রতিদিনকে বলেন , দেশে জাতীয় হৃদরোগ ইনস্টিটিউট ছাড়াও সরকারি মেডিকেল কলেজ হাসপাতালহুলোয় হৃদরোগের চিকিৎসা দেওয়া হয়। কিন্তু সেখানে পর্যাপ্ত সুযোগ সুবিধার অভাব আছে। তবে বেসরকারি মেডিকেল কলেজ হাসপাতালগুলোয় চিকিৎসা ব্যয় সাধারন মানুষের নাগালের বাইরে। এ অবস্থায় পেশেন্ট ওয়েলফেয়ার ফাউন্ডেশন নামে একটি সংস্থা তৈরির উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। প্রস্তাবিত এ সংস্থার সেক্রেটারি ডাঃলিটু বলেন , এর মাধ্যমে আমরা অস্বচ্ছল রোগীদের ফান্ডে জমাকৃত অর্থের বিনিময়ে আর্থিক সহায়তাসহ তারা যেন হাসপাতালে সঠিক চিকিৎসা নিতে পারেন সে ব্যাপারে ভুমিকা রাখব। বিশেষজ্ঞদের মতে, হৃদরোগের চিকিৎসা অনেকটা রাজধানী কেন্দ্রিক। জেলা সদর হাসপাতালেয় এখনো জোড়াতালি দিয়ে সেবা চলছে। সারা দেশের রোগীর চাপ সামলানো রাজধানীর হাসপাতালগুলোর পক্ষে কষ্টসাধ্য। কার্ডিয়াক সোসাইটির তথ্যে হৃদরোগ বিশেষজ্ঞ ও চিকিৎসাবিদ সহ বর্তমানে নিবন্ধিত আছেন ৩৮৩ জন চিকিৎসক। এদের অর্ধেকের বেশি ঢাকায় অবস্থান করছেন । বেসরকারি পর্যায়ে যে হৃদরোগে বিশেষজ্ঞ আছেন তারাও নিজেদের প্রসার জমাতে ঢাকায় থাকতে ইচ্ছুক। স্বাস্থ্য মন্ত্রনালয় থেকে স্বীকার করা হয়েছে হৃদরোগ বিশেষজ্ঞরা জেলা বা উপজেলায় যেতে চান না। বদলি করলেও তারা থাকতে চান না। বিশেষজ্ঞরা জানান, উপজেলা পর্যায়ে কয়েকজন কার্ডিওলজিষ্ট পদায়ন ও ইসিজি মেশিন জোগান দিতে পারলে রোগীদের রাজধানীমূখি প্রবণতা অনেকটা কমানো সম্ভব। জাতীয় হৃদরোগ ইনস্টিটিউটের কার্ডিওলজি ডিপার্টমেন্টের সহকারী অধ্যাপক ডা. এমজি আজম বলেন, জেলা সদর হাসপাতালগুলোয় সিসিইউর ব্যবস্থা করে দিলে রোগীদের ঢাকামুখি প্রবণতা কমবে। বিভিন্ন জেলায় হৃদরোগ সংক্রান্ত আলাদা বিভাগ চালু করা প্রয়োজন বলে মনে করেন তিনি। একই সঙ্গে বেসরকারি হাসপাতাল কর্তৃপক্ষকে সবার জন্য চিকিৎসাসেবা দেওয়া মনোভাব রেখেই ফি নির্ধারণ করতে বলেন।