৭৯ ভাগ খাদ্যভাগই ভেজাল :

খাদ্যে ভেজাল ও এর ক্ষতিকারক প্রভাব

মহাখলী পাবলিক হেলথ ইনস্টিটিউট খাদ্য পরীক্ষাগারের তথ্যানুযায়ী দেশের ৫৪ ভাগ খাদ্যপণ্য ভেজাল ও দেহের জন্য মারাত্মক ক্ষতিকর। সারা দেশ থেকে স্যানেটারি ইন্সপেক্টরদের পাঠানো খাদ্যদ্রব্যাদি পরীক্ষাকালে এ তথ্য বেরিয়ে আসে। ঢাকা সিটি কর্পোরেশনের (ডিসিসি) খাদ্য পরীক্ষাগারের পাওয়া তথ্য আরও ভয়ঙ্কর। ডিসিসির স্বাস্থ্য কর্মকর্তা জানান, রাজধানীতে বাজারজাত হওয়া খাদ্যপণ্যের অন্তত ৭৯ ভাগই ভেজাল। পরিবেশ বাঁচাও আন্দোলনের এক গবেষনা সূত্রে জানা যায়, শুধু ভেজাল খাদ্য গ্রহণের ফলে দেশে প্রতি বছর প্রায় তিন লাখ লোক ক্যান্সারে আক্রান্ত হচ্ছে। ডায়াবেটিসে আক্রান্তের সংখ্যা দেড় লাখ, কিডনি রোগে আক্রান্তের সংখ্যা ২ লাখ। এ ছাড়া পরবর্তী মায়ের শারীরিক জটিলতাসহ গর্ভজাত বিকলাঙ্গ শিশুর সংখ্যা প্রায় ১৫ লাখ। এদিকে ক্রেতারা বাজার থেকে উচ্চমূল্যে খাবর  কিনলেও তা খেয়ে আদৌ সুস্থ থাকবেন কিনা এ নিয়ে শঙ্কায় আছেন। বাজারে বিক্রি হওয়া মাংস, দুধ, ফল, খাবার মসলা, সবজি , শিশুখাদ্য, প্যাকেট ও মিষ্টিজাত খাবার , ভেজাল পানীয় , আচারসহ প্রায় সব ধরনের খাবারেই এখন ভেজাল। ভেজালের ভিড়ে আসল পণ্যই হারিয়ে গেছে। লাভের আশায় কতিপয় অসাধু ব্যবসায়ী ও ভেজাল খাবার তৈরির সিন্ডিকেট দেশব্যাপী ছড়িয়ে দিচ্ছে খাওয়ার অনুপযোগী ও অসাস্থ্যকর সব ধরনের ভেজাল খাবার। এর মধ্যে ব্যবহৃত হচ্ছে বিষাক্ত ফরমা কেমিক্যাল রং, সোডা, স্যাকারিন, মোম, ট্যালকম পাউডার, যানবাহনে ব্যবহৃত মবিল ইত্যাদি। অনুসন্ধানে জানা যায়, বিষাক্ত ফরমালিন যা মানবদেহে ক্যান্সারে সৃষ্টিকারী রাসায়ানিক হিসেবে চিহ্নিত তা বাজারের অধিকাংশ খাদ্যে ব্যবহৃত হচ্ছে। কয়েক বছর ধরেই সংরক্ষণের জন্য বিত্রেতারা কাঁচা মাছে ফরমালিন ব্যবহার করেছেন। এ ছাড়া আম , কলা, খেজুর , পেঁপে ,আনারস, মালটা, আপেল,আঙ্গুর এসব ফলেও ব্যবহৃত হচ্ছে ফরমালিন। শুধু মাছ ও ফলেই নয়, এখন ফরমালিন মেশানো হচ্ছে দুধেও। ফরমালিন খাদ্যে পরিপাক বাধাগ্রস্ত ও চোখের কর্নিয়ার ক্ষতি করে। এতে লিভারের এনজাইম নষ্ট ও কিডনির কোষ নেফ্রন ধ্বংস হয়। অসাধু ব্যবসায়ীরা লাভের আশায় সঠিক ও বিশুদ্ধ খাদ্য উপাদানের পরিবর্তে শিশুখাদ্যে ব্যবহার করেছেন বিষাক্ত কেমিক্যাল ও পঁচা ট্যালকম পাউডার, পঁচা  বরই, তেতুঁল, আম, আমড়া , ঘন চিনি ইত্যাদি। ভালো কোম্পানির মোড়ক দেখে প্রতারিত হচ্ছেন অভিভাবকেরাও । সন্তানের আবদার মেটাতে তারা অজান্তে কিনে দিচ্ছেন ভেজাল আইসক্রিম, জুস, চকোলেট ও আচারসহ বিভিন্ন শিশুখাদ্য। অধিক মুনাফার জন্য এক শ্রেণীর অসাধু ব্যবসায়ী মসলায় কাপড়ের বিষাক্ত রং, দৃর্গন্ধময় পটকা মরিচের গুড়া (নিম্নমানের মরিচ ) ধানের তুষ ইট ও কাঠের গুড়া, মোটার ডাল ও সুজি ইত্যাদি মেশাচ্ছেন । এ ব্যাপারে বিশেষজ্ঞরা উদ্বেগ প্রকাশ করে জানান, ভেজাল মসলা কিনে ক্রেতারা শুধু প্রতারিত হচ্ছেন না, এতে তৈরি হচ্ছে মারাত্মক স্বাস্থ্যঝুকি। কারণ ভেজাল মসলায় মেশানো ক্ষতিকর খাদ্যদ্রব্য ক্যান্সার, কিডনি ও লিভারের রোগ সৃষ্টির জন্য দায়ী। অনুসন্ধানে জানা যায়, ভেজাল মসলা উৎপাদনকারীরাগুড়া মরিচের সঙ্গে মেশাচ্ছেন ইটের গুড়া। হলুদে দেওয়া হচ্ছে মোটর ডাল, ধনিয়ার স’মিলের কাঠের গুড়া আর পোস্তাদানায় সুজি। মসলার রং আকর্ষনীয় করতে মেশানো হচ্ছে বিশেষ ধরনের কেমিক্যাল রং। রাজধানীর শ্যামবাজার , কারওয়ানবাজার, মোলভীবাজার, টঙ্গী ওমিরপুর এলাকার বিভিন্ন পাইকারি মসলার বাজার এবং ভাঙ্গানোর কারখানায় এসব ভেজাল মেশানো হচ্ছে। তবে হোটেল-রেস্তোরায় ভেজাল মসলা মেশানোর হার বেশি। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের পুষ্টি ও খাদ্যবিজ্ঞান ইনস্টিটিউটের অধ্যাপক ড. গোলাম মাওলা বলেন, মসলার ব্যবহৃত কাপড়ের রং শরীরের জন্য অত্যান্ত ক্ষতিকর।এর কারনে ক্যান্সার হওয়ার আশঙ্কা থাকে। এ ছাড়া এর মাধ্যমে মানবদেহে হেপাটাইসিস আক্রান্ত এবং কিডনি ও লিভারের ক্ষতি হওয়ার আশঙ্কা থাকে। খোঁজ নিয়ে জানা যায়, রাজধানীর কামরাঙ্গীচর, লালবাগ, চকবাজার , কেরানীগঞ্জ ও শনির আখড়াসহ বিভিন্ন এলাকায় ভেজাল শিশু খাদ্যের শত শত কারখানা গড়ে উঠেছে। অন্যদিকে রাজধানীর শনির আখড়া, কামরাঙ্গীচর , কেরানীগঞ্জ, পুরান ঢাকার বিভিন্ন এলাকায় রয়েছে ভেজাল আইসক্রিম তৈরির অসংখ্য কারখানা। এ বিষয়ে জাতীয় অধ্যাপক এম আর খান বলেন, ভেজাল ও বাসি খাবার খাওয়ার ফলে প্রথমে শিশুরা ডায়রিয়া ও ম্যালেরিয়ার আক্রান্ত হচ্ছে। কিন্তু দীর্ঘদিন ধরে খাওয়ার ফলে শিশুদের লিভার , কিডনি ও ফুসফুসের ক্ষতির আশঙ্কা রয়েছে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *