ডায়াবেটিস চিকিৎসার মূলমন্ত্র

ডায়াবেটিস চিকিৎসার মূলমন্ত্র

ডায়াবেটিস চিকিৎসার মূলমন্ত্র

ডায়াবেটিস একটি বিপাকীয় রোগ। বাংলাদেশ সহ বিশ্বের কোটি  কোটি মানুষ এ রোগে ভুগছে। ব্যয়বহুল ও দীর্ঘমেয়াদি এ রোগের প্রকোপ দিন দিন বেড়েই চলছে। ডায়াবেটিস নিয়ন্ত্রণে রেখে স্বাভাবিক কর্মময় জীবন যাপন করা সম্ভব। আর এর জন্য চাই রোগীর নিজের শিক্ষা ও সচেতনতা।

ডায়াবেটিস নিয়ন্ত্রনের উপায়

ডায়াবেটিস রোগীর রক্তের চিনি নিয়ন্ত্রণ করা খুব কঠিন নয়। একজন ডায়াবেটিসের রোগী ঘরে বসে নিজের সুগারকে নিয়ন্ত্রনে রাখতে পারেন। গ্লুকোমিটার দিয়ে ঘন ঘন রক্তের চিনি পরীক্ষা করে। এর জন্য প্রয়োজন ডাক্তারের পরামর্শ অনুসারে উপযুক্ত  জ্ঞান আহরন করা এবং ট্রেনিং নেওয়া। রোগীদের যে ব্যাপারে জানতে হয়, তা হলো খাদ্য, ব্যায়াম, ঔষধ এবং সর্বক্ষেত্রে শৃঙ্খলাবোধ।

খাদ্যভ্যাস

ডায়াবেটিস নিয়ন্ত্রনের জন্য খাদ্যাভ্যাসের ভূমিকা খুবই গুরুত্বপূর্ণ। ডাক্তারের পরামর্শ অনুসারে সময়মতো এবং পরিমাণমতো খাওয়ার অভ্যাস গড়ে তুলতে হবে। প্রোটিন ও ফ্যাট বেশির ভাগ লোকই স্বাভাবিক চাহিদার চেয়ে অনেক কম খেয়ে থাকেন। তবে শর্করাটা আমরা বেশি খেয়ে থাকি। শর্করা কমিয়ে শাকসবজির পরিমাণ বাড়াতে হবে। চিনি ও মিষ্টি জাতীয় খাবার বাদ দিতে হবে। খাওয়া-দাওয়ার ব্যাপারে অহেতুক চিন্তিত হওয়ার কোনো কারন নেই। খাদ্য ও পুষ্টির চাহিদা ডায়াবেটিস হওয়ার আগে যে রকম থাকে, পরেও একই থাকে। পুষ্টির চাহিদার কোনো তারতম্য হয় না। খাদ্যের নিয়ম মেনে চলার উদ্দেশ্যে হলো- ডায়াবেটিস নিয়ন্ত্রনে রাখা , স্বাস্থ্য ভালো রাখা এবং স্বাভাবিক ওজন বজায় রাখা।খাদ্য ব্যবস্থার গুরত্ব বোঝানোর জন্য বর্তমানে এক মেডিকেল নিউট্রিশন থেরাপি বলা হয়।

ব্যায়াম

ডায়াবেটিসের রোগীর ব্যায়ামের বিকল্প নেই।ব্যায়াম মাংসপেশির জড়তা দূর করে রক্ত চলাচলে সাহায্য করে। ইনসুলিনের কার্যকারিতা এবং নিঃসরন বাড়ায়। ডায়াবেটিসের রোগীর রক্তে ভালো কোলেস্টরল কম থাকে, যা করোনারি হার্ট ডিজিজের একটি বড় ঝুঁকি বলে স্বীকৃত, তা ব্যায়ামের মাধ্যমে বাড়ানো যায়। প্রতিদিন কমপক্ষে ৩০ মিনিট করে ব্যায়াম করা একান্ত প্রয়োজন।

শিক্ষা

ডায়াবেটিস আজীবনের রোগ। ডায়াবেটিস নিয়েই ডায়াবেটিক রোগীকে বাঁচতে হয়। এ জন্য প্রয়োজন উপযুক্ত শিক্ষা। রোগীকে সাহায্য করার জন্য রোগীর কাছের আত্মীয়দেরও ই রোগ সম্পর্কে জানতে হবে। শিক্ষিত সচেতন রোগী নিজেই রোগ নিয়ন্ত্রনে রাখার দক্ষতা অর্জন করেন। পরবর্তী সময়ে জীবন প্রণালী সহজভাবে গ্রহন করতে পারেন এবং জরুরি অবস্থা সহজেই মোকাবিলা করতে পারেন। শিক্ষার গুরত্বপূর্ণ ভূমিকার জন্য বর্তমানে ডায়াবেটিসের শিক্ষাকে ডায়াবেটিস নিয়ন্ত্রনের অন্যতম ব্যবস্থা বলে গন্য করা হয়।

শৃঙ্খলা (Restriction/ Discipline)

শৃঙ্খলা ডায়বেটিক রোগীর জীবনকাঠি যারা শৃঙ্খলা মেনে চলে, তাদের পক্ষে ডায়বেটিস নিয়ন্ত্রনে রাখা খুবই সহজসাধ্য ব্যাপার । সুশৃঙ্খল জীবনযাপন রোগকে দূরে রাখতে যথেষ্ট সাহায্য করে থাকে। নীরব ঘাতক ডায়বেটিস রোগটি সুনিয়ন্ত্রণে রাখলে স্বাভাবিক জীবনযাপন যেমন সম্ভব, তেমনি অনিয়ন্ত্রিত ডায়বেটিসের রোগীর জন্য প্রতিনিয়ত বয়ে আনে নানা সমস্যা। অনিয়ন্ত্রিত ডায়াবেটিসের রোগীকে অন্ধ করতে পারে, পঙ্গু করতে পারে। কিডনি এবং হার্টের ক্ষতি করে অকালমৃত্যুর কোলে ঠেলে দিতে পারে। এ জন্য মাঝেমধ্যে সুগার পরীক্ষা করাতে হবে। রক্তচাপ মাপতে হবে এবং রক্তের কোলেষ্টেরল দেখতে হবে। হার্ট কিডনি এবং চোখের কোনো সমস্যা হচ্ছে কি না, তা নিয়ে ডাক্তারের সাথে পরামর্শ করতে হবে।

মনে রাখতে হবে, প্রাথমিক অবস্থায় এগুলো ধরা পড়লে সহজেই তার সমাধান করা যায়। ডায়াবেটিস নিয়ন্ত্রণ আছে কিনা , তা দেখার জন্য মাঝে মধ্যে রক্তের সুগার টেষ্ট করাতে হয়। গ্লুকোমিটার দিয়ে বাড়িতে সুগার টেষ্ট করা যায়। এসব ছোট মেশিন অল্প দামে আমাদের দেশেও পাওয়া যায়। অভুক্ত অবস্থায় রক্তের সুগারের পরিমানে ৬মিলিমোল/লিটারের কাছাকাছি হলে ভালো নিয়ন্ত্রণে আছে বলে মনে করতে হবে। রক্তে HbAlc মেপেও নিয়ন্ত্রনের ধারণা করা যায়। HbAlc-৭% নিচে হলে তিন মাস ধরে সুগার ভালো নিয়ন্ত্রণে আছে বলে ধরা হয়। পরিশেষে বলতে চাই, আধুনিক পদ্ধতিতে ডায়াবেটিস নিয়ন্ত্রণে রেখে সুস্থ,স্বাভাবিক, কর্মময় জীবন যাপন করা সম্ভব। তাই আসুন, ডায়াবেটিস সম্পর্কে জানি, এ সম্পর্কে সঠিক শিক্ষা গ্রহণ করি, সুশৃঙ্খল জীবন যাপন করি।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *